চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে এক ধরনের নীরব মনোযোগ। আনুষ্ঠানিকতার ভেতরেও যেন ভেসে বেড়াচ্ছিল কিছু অপ্রকাশিত প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই আমাদের সন্তানদের মানুষ করে তুলছি, নাকি শুধু সাফল্যের সনদে সীমাবদ্ধ করে ফেলছি তাদের ভবিষ্যৎ?
বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এমনই এক প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
তাঁর কণ্ঠে ছিল সতর্কতা, আবার ছিল গভীর মানবিকতার আবেদন।
“আমরা সবাই এখন নিজের সন্তানকে ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ পাওয়ানোর দৌড়ে ব্যস্ত। কিন্তু আমরা কি ভাবছি—আমার সন্তানটি প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠছে কি না?”—এই প্রশ্নে যেন থমকে গেল পুরো আয়োজন।
অটিজম: চিকিৎসার গণ্ডি পেরিয়ে সমাজের আয়না :
“অটিজম কোনো সীমাবদ্ধতা নয়, প্রতিটি জীবন মূল্যবান”—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে জেলা প্রশাসন ও জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে অটিজমকে নতুনভাবে দেখার আহ্বান উঠে আসে।
জেলা প্রশাসক তাঁর বক্তব্যে ফিরে যান ইতিহাসে। ১৯৪৩ সালে ডোনাল্ড গ্রে ট্রিপলেটকে ঘিরে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. লিও কানারের গবেষণার মধ্য দিয়েই আধুনিক অটিজম ধারণার সূচনা।
‘অটিজম’ শব্দটির শিকড় গ্রিক ‘অটোস’—অর্থাৎ নিজেকে কেন্দ্র করে থাকা। কিন্তু আজ অটিজম শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়—এটি এক জটিল সামাজিক বাস্তবতা।
দৃশ্যের আড়ালে থাকা অদেখা কষ্ট :
“আমরা মঞ্চে যারা কথা বলি, আমরা পিছনের চিত্রটা তুলে ধরি না”-বলছিলেন জেলা প্রশাসক। তাঁর কথায় উঠে আসে এক কঠিন বাস্তবতা-দেশের লাখো অটিস্টিক শিশুর পরিবার নীরবে লড়াই করে যাচ্ছে।
এই লড়াইয়ের গল্প নেই সংবাদে, নেই আলোচনার কেন্দ্রেও। অথচ প্রতিটি দিন তাদের জন্য একেকটি চ্যালেঞ্জ।
সংখ্যা বাড়ছে, নাকি বেড়েছে সচেতনতা?
সম্প্রতি চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে অটিজম ইউনিট পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে এখন অটিজম দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। আগে যেগুলো অজানা ছিল, এখন সেগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে।
তবে এর পাশাপাশি উঠে এসেছে কিছু উদ্বেগের কারণ—খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, অল্প বয়সে মাতৃত্ব এবং সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন।
পরিবার আছে, কিন্তু সম্পর্ক কোথায়?
“একসময় ‘পরিজন’ শব্দটির গভীরতা ছিল”-এই কথায় যেন ধরা পড়ে সময়ের পরিবর্তন। পরিবারকেন্দ্রিক সমাজ হলেও মানবিক সংযোগ ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
ব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন আর ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সম্পর্কের উষ্ণতা-যা শিশুর মানসিক বিকাশে সবচেয়ে জরুরি।
উদাহরণে অনুপ্রেরণা, কিন্তু বাস্তবতা কঠিন :
স্টিফেন হকিং, মাইকেল ফেলপস কিংবা জে. কে. রাউলিং-বিশ্বখ্যাত এই মানুষদের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষের মানসিক জগৎ জটিল। একাকিত্ব, গ্রহণ-বর্জন—এসবই অটিজম আলোচনার অংশ।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সবার পেছনে এমন সহায়ক পরিবেশ থাকে না।
দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়, সবার :
জেলা প্রশাসক মনে করিয়ে দেন-অন্যের ভুল খুঁজে বের করা সহজ, কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালনই আসল চ্যালেঞ্জ। শুধু সহায়তা নয়, প্রতিরোধ নিয়েও ভাবতে হবে।
“একজন অসুস্থ মানুষ সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে পারে না”-এই কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর মূল বার্তা।
পশ্চিমা অনুকরণ নয়, নিজস্ব মূল্যবোধ :
পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। ইউরোপ-আমেরিকার সমাজ কাঠামো আর বাংলাদেশের বাস্তবতা এক নয়। তাই নিজের সংস্কৃতি, পরিবার ও মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ রাখার ওপর জোর দেন তিনি।
মানুষ হওয়ার শিক্ষা :
“সূর্যের যদি তাপ না থাকে, তবে তার কোনো মূল্য নেই”—এই উপমায় তিনি বোঝান মানবিকতার গুরুত্ব। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে মানুষ। আর মানুষ হওয়ার জন্য দরকার সহমর্মিতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—“আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়, আমি মানুষ।”
সহায়তা নয়, সম্মানের অধিকার :
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের পক্ষ থেকে ২৬ জন দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীর মাঝে অনুদান বিতরণ করা হয়। তবে এই সহায়তার মধ্যেও ছিল একটি বড় বার্তা—সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন সম্মান ও অন্তর্ভুক্তি।
দিনের শেষে প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে শিশুরা শুধু পরীক্ষার ফল নয়, মানবিকতায়ও বড় হয়ে উঠবে?
অটিজম সচেতনতার এই আয়োজন যেন শুধু একটি দিবসের আনুষ্ঠানিকতা নয়—বরং আমাদের সমাজকে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ।

