চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে দিনের আলোয় গয়নার দোকানে দুঃসাহসিক ছিনতাইচেষ্টার ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—এটি নতুন কৌশলে সংঘটিত পরিকল্পিত অপরাধ প্রবণতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বোরকার আড়ালে ‘ক্রেতা’ পরিচয়ে প্রবেশ, এরপর মুহূর্তেই মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে কর্মচারীদের অক্ষম করে সোনা লুটের চেষ্টা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি ছিল ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনার বহিঃপ্রকাশ।
মঙ্গলবার দুপুরে পৌর সদরের বিবির হাট এলাকায় নিউ টুনটু জুয়েলার্সে ঢোকেন সালমা আকতার নামের এক নারী।
প্রথমে সাধারণ ক্রেতার মতো আচরণ—সোনার হার, চুড়ি দেখতে চাওয়া, কর্মচারীদের আস্থা অর্জন—সবই ছিল ছকবদ্ধ নাটকের অংশ। কর্মচারীরা শোকেস খুলে গয়না বের করার সঙ্গে সঙ্গেই আচমকা বদলে যায় দৃশ্যপট।
এক মুহুর্তেই বোরকার পকেট থেকে মরিচের গুঁড়া বের করে তিন কর্মচারীর চোখেমুখে ছিটিয়ে দেন তিনি।
মুহূর্তেই দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন তারা। সেই সুযোগে চুড়ি, কানের দুল ও হারসহ প্রায় সাড়ে তিন ভরি সোনা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন সালমা।
কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী পালানো সহজ হয়নি। চোখে জ্বালা ও অন্ধত্বের মধ্যেও একজন কর্মচারী কৌশলে তাঁর দুই হাত চেপে ধরেন। দোকানের অন্য কর্মচারী ও আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে আটকে ফেলেন। বারবার ধাক্কা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হন তিনি।
পরে খবর পেয়ে পুলিশ এসে সালমা আক্তারকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
তদন্তে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম খানের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের দিন সোমবারও একই উপজেলার আরেকটি জুয়েলারির দোকানে চুরির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অর্থাৎ এটি ছিল একদিনের হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে একই কৌশল প্রয়োগের প্রচেষ্টা।
দোকান মালিক সুমন ধর জানিয়েছেন, লক্ষ্য ছিল সাড়ে তিন ভরি সোনা—যার বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্য। তার ভাষায়, “ছিনতাইয়ের চেষ্টা ছিল সুপরিকল্পিত, কিন্তু কর্মচারীদের তাৎক্ষণিক সাহসিকতায় বড় ক্ষতি এড়ানো গেছে।”
এই ঘটনা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
প্রথমত, অপরাধীরা এখন সরাসরি শক্তি প্রয়োগের বদলে কৌশলী ও রাসায়নিক আক্রমণের পথ বেছে নিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, নারী পরিচয় ও ধর্মীয় পোশাককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
তৃতীয়ত, একই কৌশলে ধারাবাহিকভাবে একাধিক দোকান টার্গেট করা—এটি সংঘবদ্ধ বা অন্তত পরিকল্পিত অপরাধের ইঙ্গিত দেয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দোকানগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত এই ধরনের হঠাৎ আক্রমণ ঠেকাতে—সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।
সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও তা প্রতিরোধ নয়, বরং ঘটনার পর প্রমাণ হিসেবে কাজে আসে।
ফটিকছড়ির এই ঘটনা তাই শুধু একটি ব্যর্থ ছিনতাই নয়—এটি ভবিষ্যতের আরও বড় অপরাধের সম্ভাব্য পূর্বাভাস হিসেবেও দেখা উচিত।

