back to top

এলডিসি উত্তরণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে এসএমই খাত: সেমিনারে আশঙ্কা

প্রকাশিত: ১৬ মে, ২০২৬ ১৭:৩৩

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, বিনিয়োগে মন্থরতা, জ্বালানির অনিশ্চয়তা ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা।

তাঁরা বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সময়োপযোগী নীতি সহায়তা, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

শনিবার রাজধানীতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক (ইপিআই): ঢাকার সামষ্টিক অর্থনীতির ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রচলিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা ও তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের প্রতিফলন দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এ বাস্তবতায় ডিসিসিআই প্রণীত অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক (ইপিআই) নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও গবেষকদের কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।

সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই মহাসচিব (ভারপ্রাপ্ত) ড. একেএম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী।

তিনি জানান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি পূরণে ডিসিসিআই ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে অর্থনৈতিক অবস্থান মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

গবেষণায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এতে উৎপাদন ও সেবাখাত মিলিয়ে ৭৬২ জন প্রতিনিধির তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষিতে খাদ্যপণ্য উৎপাদন কমছে। জ্বালানি সংকটে শিল্পখাতে উৎপাদনে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সেবাখাতও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিস্থিতি উত্তরণে বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা, সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন, এসএমই উদ্যোক্তাদের সহজশর্তে ঋণ প্রদান, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারি লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় হয়রানি কমানোর ওপর জোর দেন তিনি। পাশাপাশি ভ্যাট হার কমানো ও বন্দরগুলোতে পণ্য খালাস দ্রুত করার সুপারিশও করা হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, গবেষণাটি বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও এটি সারাদেশে সম্প্রসারণ করা গেলে গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। এ ধরনের সূচক উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিবেশ মূল্যায়নে সহায়তা করবে।

সাপোর্ট টু সাসটেইন্যাবল প্রজেক্টের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ নেসার আহমেদ বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এসএমই খাত। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং সহায়ক নীতি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, বর্তমানে অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রবণতা এবং ব্যাংক ও আর্থিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা।

তিনি জানান, ব্যবসা সম্প্রসারণে আমদানি নীতিমালা যুগোপযোগী করতে সরকার কাজ করছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তা চূড়ান্ত হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি খাতে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি ছিল।

বিনিয়োগ স্থবিরতা অর্থনীতির গতি কমিয়ে দিয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আর্থিক খাতসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন বলেন, দীর্ঘমেয়াদি শিল্প অর্থায়নে দেশে এখনো ব্যাংক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা রয়েছে।

অথচ এ ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের ভূমিকা বেশি হওয়া উচিত ছিল। বড় অর্থায়নে পুঁজিবাজার এখনো সক্ষম হয়ে উঠতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিডার যুগ্ম সচিব মোঃ আরিফুল হক বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও নীতি সহায়তার জন্য খাতভিত্তিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বাড়ানো গেলে বেসরকারি খাতের ভোগান্তি কমবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. আখন্দ মোহাম্মদ আখতার হোসেন বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বৈদেশিক বিনিয়োগের বিকল্প নেই। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সিনিয়র প্রাইভেট সেক্টর স্পেশালিস্ট মিয়া রহমত আলী বলেন, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআইয়ের প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি আলহাজ্ব আব্দুস সালাম এবং প্রাক্তন পরিচালক এম বশিরউল্ল্যাহ ভূইয়্যা অংশ নেন।

এ সময় ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি মোঃ সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।