back to top

রক্তাক্ত ঈদ: আনন্দের দিনে চট্টগ্রামের মহাসড়কে ঝরল ৩ প্রাণ, হাসপাতালের করিডোরে স্বজনদের আহাজারি

প্রকাশিত: ২৮ মে, ২০২৬ ১৯:১২

বিশেষ প্রতিবেদক:

যেদিন ঘরে ঘরে আনন্দের জোয়ার নামার কথা, প্রিয়জনদের হাসিমুখ আর আলিঙ্গনে মুখরিত হওয়ার কথা, ঠিক সেই পবিত্র ঈদুল আজহার দিনটিই রূপ নিল এক বিষাদময় ট্র্যাজেডিতে। ঈদের আনন্দ মুহূর্তের মধ্যেই উধাও হয়ে গেল পিচঢালা সড়কের বুক চিড়ে বয়ে যাওয়া রক্তে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কর্ণফুলী উপজেলার ভেল্লাপাড়া ব্রিজ এলাকায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় কেড়ে নিয়েছে তিন-তিনটি তাজা প্রাণ। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন, যাদের অনেকেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঈদের রাতে যেখানে আনন্দের আলো জ্বলার কথা ছিল, সেখানে এখন জ্বলছে স্বজন হারানোর শোকের আগুন।

উৎসবের রাতে নেমে এল অন্ধকারের ছায়া

বৃহস্পতিবার (২৮ মে) রাত সাড়ে আটটা। ঈদের দিনের ক্লান্তি শেষে যখন মানুষ ঘরে ফিরছিল বা প্রিয়জনদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করতে বের হয়েছিল, ঠিক তখনই কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা খালের ওপর অবস্থিত ভেল্লাপাড়া ব্রিজের ওপর নেমে আসে এক নির্মম নিয়তি।

কর্ণফুলীর মইজ্জারটেক থেকে যাত্রী নিয়ে রওনা হওয়া একটি চারচাকা লেগুনাকে বিপরীত দিক থেকে আসা বেপরোয়া গতির ‘ঈগল পরিবহন’-এর একটি বাস তীব্র গতিতে ধাক্কা দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বাসের চালক আরেকটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি লেগুনাটিকে পিষে ফেলে। মুহূর্তের মধ্যেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় লেগুনাটি, বাতাসে ভেসে আসে যাত্রীদের আর্তনাদ আর বাঁচার আকুতি।

হাসপাতালের করিডোরে এখন শুধুই কান্নার রোল

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নুরুল আলম আশেক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ২৫ থেকে ৩০ জনকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

“আহতদের অনেকের অবস্থাই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। চিকিৎসকেরা তাদের বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন, তবে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।”

এস আই নুরুল আলম আশেক, চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ি।

ঈদের রাতে যেখানে চমেক হাসপাতালে থাকার কথা ছিল উৎসবের আমেজ, সেখানে এখন কেবলই কান্নার রোল। আহত ও নিহতদের তাৎক্ষণিক পরিচয় নিশ্চিত করা না যাওয়ায় হাসপাতালের করিডোরে ভিড় জমিয়েছেন শত শত ব্যাকুল স্বজন। প্রত্যেকেই নিজ প্রিয়জনের মুখটি অক্ষত দেখার প্রার্থনায় বুক বাঁধছেন।

ঘাতক চালক পলাতক: প্রশাসনের আশ্বাস

ঘটনাস্থল থেকে কর্ণফুলী থানার উপ-পরিদর্শক পরিতোষ জানান, খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ ও স্থানীয় জনতা উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া লেগুনা থেকে একে একে বের করে আনা হয় রক্তাক্ত মানুষদের।

কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিনুর আলম গভীর দুঃখ প্রকাশ করে জানান, গুরুতর আহতদের দ্রুততম সময়ে হাসপাতালে পাঠানো নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার পরপরই ঘাতক ঈগল পরিবহনের চালক ও সহকারী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পুলিশ বাসটিকে জব্দ করেছে এবং ঘাতক চালককে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান শুরু করেছে।

একটি চিরন্তন প্রশ্ন: আর কত রক্ত ঝরলে থামবে এই বেপরোয়া গতি?

একটি ঈদ, একটি উৎসবের দিন এভাবেই শেষ হয়ে গেল কয়েকটি পরিবারের চিরতরের কান্নায়। ওভারটেকিংয়ের এই মরণনেশা আর কত মায়ের কোল খালি করবে, আর কত পরিবারকে পঙ্গুত্বের অভিশাপে ঠেলে দেবে? আন্তর্জাতিক মানের সড়ক ব্যবস্থাপনার দাবি যখন প্রতিনিয়ত উঠছে, তখন ঈদের দিনেই এমন মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি আবারও আঙুল তুলল আমাদের সড়ক নিরাপত্তা ও চালকদের বেপরোয়া মানসিকতার দিকে।

নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতার জন্য পুরো চট্টগ্রামবাসী আজ শোকে স্তব্ধ হয়ে প্রার্থনা করছে।