back to top

‘মেমেই’ রহস্য: নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজ কেন কিনল এসএন কর্পোরেশন?

ফের আলোচনায় ‘ডিসকো শওকত’

প্রকাশিত: ০৪ জুন, ২০২৬ ০৯:৪৯

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে নোঙর করে থাকা একটি পুরোনো কেমিক্যাল ট্যাংকার হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

‘মেমেই’ নামের প্রায় ৬১ কোটি টাকা মূল্যের জাহাজটি সীতাকুণ্ডে ভাঙার জন্য কিনেছিল চট্টগ্রামের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর মালিকানাধীন এসএন কর্পোরেশন।

কিন্তু জাহাজটি বাংলাদেশে পৌঁছানোর মাত্র ছয় দিনের মাথায় ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহনের অভিযোগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত হয়।

এরপরই সামনে আসে আরও বড় প্রশ্ন—যে প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন জাহাজগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরান-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যের অভিযোগে আন্তর্জাতিক নজরদারিতে ছিল, তাদের কাছ থেকে কেন জাহাজ কিনল এসএন কর্পোরেশন?

আর এই ঘটনার মধ্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘ডিসকো শওকত’ নামে পরিচিত শওকত আলী চৌধুরী এবং তার প্রতিষ্ঠানের অতীতের বিতর্কিত লেনদেন।

ভাঙার জন্য কেনা জাহাজ, নিষেধাজ্ঞায় আটকে যাওয়ার গল্প :
আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ৪৪ হাজার ৮০০ টন ধারণক্ষমতার কেমিক্যাল ও অয়েল ট্যাংকার ‘মেমেই’ (আইএমও: ৯১৩৩০৮২) গত ২২ মে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়।

জাহাজটি স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি হয়ে এসএন কর্পোরেশনের সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল।

১৯৯৭ সালে নির্মিত পালাউ-পতাকাবাহী জাহাজটির লাইট ডিসপ্লেসমেন্ট টনেজ (এলডিটি) ৯ হাজার ৮৭৭ দশমিক ১ টন।

জাহাজ রিসাইক্লিং বাজারসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এর আনুমানিক স্ক্র্যাপ মূল্য প্রায় ৪৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০ কোটি ৮৮ লাখ টাকার সমান।

কিন্তু জাহাজটি ইয়ার্ডে নেওয়ার আগেই পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়।

চট্টগ্রামে পৌঁছানোর ছয় দিনের মাথায় কালো তালিকায় ‘মেমেই’ :
গত ২৮ মে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) ‘মেমেই’কে নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত করে।

মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে জাহাজটি ইরান থেকে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহনে অংশ নিয়েছিল।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির অংশ হিসেবে নির্বাহী আদেশ ১৩৮৪৬-এর আওতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

ফলে যে জাহাজটি সীতাকুণ্ডের সৈকতে কাটা হওয়ার কথা ছিল, সেটি এখন চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আটকে আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আইনি ও বাণিজ্যিক জটিলতার কারণে জাহাজটিকে মূল মালিকের কাছে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

শুধু ‘মেমেই’ নয়, নিষেধাজ্ঞায় মালিক কোম্পানিও: 
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শুধু জাহাজটির ওপর সীমাবদ্ধ থাকেনি। ‘মেমেই’-এর নিবন্ধিত মালিক হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এভার শাইনিং লিমিটেডকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মালিকানাধীন আরেকটি জাহাজ ‘ফ্লোরা’ ২০২৩ সাল থেকে অন্তত ১৪ বার ইরান থেকে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহন করেছে।

মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি জেনেশুনে ইরানি পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ক্রয়, বিক্রয়, পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

এ কারণেই ‘মেমেই’ এবং ‘ফ্লোরা’কে প্রতিষ্ঠানটির স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: তথ্য জানা ছিল না, নাকি ঝুঁকি জেনেও চুক্তি?
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানেই। আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন খাতে জাহাজের মালিকানা, রুট, বাণিজ্যিক ইতিহাস এবং নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত ঝুঁকি যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন উন্মুক্ত ও বাণিজ্যিক ডাটাবেস ব্যবহৃত হয়। বড় অঙ্কের জাহাজ ক্রয়ের আগে এমন যাচাই আন্তর্জাতিক ব্যবসার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, এভার শাইনিং লিমিটেড এবং তাদের জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ও নজরদারির তথ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল, সেগুলো কি এসএন কর্পোরেশনের অজানা ছিল?

নাকি সম্ভাব্য ঝুঁকি জেনেও জাহাজটি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল?

এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে ‘মেমেই’কে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এসএন কর্পোরেশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া।

আবারও আলোচনায় ‘ডিসকো শওকত’:
‘মেমেই’ বিতর্ক নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে শওকত আলী চৌধুরীকে, যিনি ব্যবসায়িক অঙ্গনে ‘ডিসকো শওকত’ নামে বেশি পরিচিত।

চট্টগ্রামভিত্তিক এই ব্যবসায়ী বর্তমানে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে তিনি এসএন কর্পোরেশনের মালিক, যে প্রতিষ্ঠান ‘মেমেই’ জাহাজটি কিনেছিল।

বন্দর, শিপব্রেকিং শিল্প ও আমদানি-রপ্তানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত নাম হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার প্রতিষ্ঠানের কিছু আর্থিক ও বাণিজ্যিক লেনদেনও আলোচনায় এসেছে।

পুরোনো বিতর্কের ছায়া: ৮ হাজার কোটি টাকার অনুসন্ধান:
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এসএন কর্পোরেশনের পক্ষে খোলা কয়েকটি ঋণপত্রের সুবিধাভোগী ছিল একই ঠিকানায় নিবন্ধিত তিনটি বিদেশি কোম্পানি।

পরবর্তীতে এসব প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজে পায়নি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট।

এসব লেনদেনকে কেন্দ্র করে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়।

যদিও ওই অনুসন্ধানের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ্যে আসেনি, তবে ঘটনাটি এসএন কর্পোরেশনকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

‘মেমেই’ কাণ্ডের পর সেই পুরোনো প্রশ্নগুলো আবারও সামনে চলে এসেছে।

একটি জাহাজের চেয়েও বড় হয়ে উঠছে যে প্রশ্ন:
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে নোঙর করে থাকা ‘মেমেই’ আপাতদৃষ্টিতে একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ।

কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ইরান-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য, অফশোর মালিকানা এবং বাংলাদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঘটনা কেবল একটি জাহাজ আটকে যাওয়ার ঘটনা নয়।

বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা-সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি উপেক্ষা করে করা কোনো বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম, আর্থিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

আর সেই কারণেই ‘মেমেই’ এখন আর শুধু একটি জাহাজের নাম নয়; এটি হয়ে উঠেছে ‘ডিসকো শওকত’-এর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে ঘিরে নতুন করে উত্থাপিত একাধিক প্রশ্নের প্রতীক।