বিশেষ প্রতিবেদক :
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি স্তরে সংস্কারের হাওয়া লাগলেও, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) একটি বিশেষ বিভাগে এখনো জেঁকে বসে আছে বিগত আমলের দোসররা। বিসিবির সাংবাদিক অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বিতরণ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি কুখ্যাত ‘সিন্ডিকেট’ এবং এর দুই মূল হোতার বিরুদ্ধে এবার তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে সংবাদকর্মী মহলে।
অভিযোগ উঠেছে, যোগ্য, পেশাদার ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ ক্রীড়া সাংবাদিকদের পদ্ধতিগতভাবে বঞ্চিত করে, সম্পূর্ণ অনৈতিক উপায়ে নিজেদের পছন্দের অযোগ্য ব্যক্তিদের কার্ডের সুবিধা দিচ্ছে এই চক্র। এই বৈষম্যমূলক ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজ এখন রাজপথে সোচ্চার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বিসিবির অ্যাক্রেডিটেশন কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করে রেখেছেন নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা। এর মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন দুজন—বিসিবির চট্টগ্রাম কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন হোসেন এবং মিডিয়া বিভাগের কর্মকর্তা মুস্তাফিজ খালু।
অভিযোগ রয়েছে, এই দুই কর্মকর্তাই বিসিবির পুরো অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বণ্টন প্রক্রিয়াকে একটি ব্যক্তিগত ‘সিন্ডিকেটে’ রূপান্তর করেছেন। তাদের সাথে যারা ‘বিশেষ সুসম্পর্ক’ বজায় রাখতে পারেন এবং অনৈতিক সুবিধা প্রদান করেন, কেবল তারাই বছরের পর বছর কার্ডের আশীর্বাদ পেয়ে আসছেন। অথচ জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের অসংখ্য দক্ষ, তরুণ এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ক্রীড়া সাংবাদিকদের আবেদন রহস্যজনক কারণে বারবার প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।
চক্রটির অনিয়মের পরিধি এতটাই বিস্তৃত যে, কোনো রকম নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সরকারি নিবন্ধনহীন ও অখ্যাত অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং নামসর্বস্ব মাল্টিমিডিয়া মাধ্যমের কর্মীদেরও দেদারসে কার্ড দেওয়া হচ্ছে। বিপরীতে, মাঠপর্যায়ে দিনরাত কাজ করা প্রকৃত সংবাদকর্মীরা চরম অবহেলার শিকার হচ্ছেন।
বিসিবির এই প্রাতিষ্ঠানিক স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামের একাধিক মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীর সাফ দাবি—বিসিবি থেকে এই স্বৈরাচারী আমলের দোসরদের অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
চট্টগ্রামে কর্মরত একটি জাতীয় দৈনিকের এক প্রতিবেদক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: “যারা নিয়মিত মাঠে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কাজ করেন, সংবাদ তৈরি করেন সাংবাদিকতাকে মূল পেশা হিসেবে নিয়েছেন, তাদের অ্যাক্রেডিটেশন দেওয়া হয় না। অথচ এমন অনেককে কার্ড দেওয়া হচ্ছে যাদের মাঠে উপস্থিতি মূলত আনুষ্ঠানিকতা কিংবা ব্যক্তিগত প্রচারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।”
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের সাংবাদিকরা দাবি তুলেছেন, বর্তমান বিতর্কিত ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া বাতিল করে অবিলম্বে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি / সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি যৌথ সুপারিশের ভিত্তিতে সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড প্রদানের নতুন ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এই সিন্ডিকেটের কারণে প্রকৃত সংবাদকর্মীদের মধ্যে ক্রমাগত হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিবিরই এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব থাকায় বোর্ডে একটি শক্তিশালী ও দুর্নীতিপরায়ণ ‘প্রভাববলয়’ তৈরি হয়েছে, যা নতুন ও যোগ্য আবেদনকারীদের সমান সুযোগ পাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে।
সাংবাদিক সমাজ এই সিন্ডিকেট ভাঙতে ৩টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন: কার্ড প্রদানের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ও আন্তর্জাতিক মানের নীতিমালা ও যোগ্যতার মানদণ্ড প্রকাশ করতে হবে। আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে, যেন পর্দার আড়ালের কারসাজি বন্ধ হয়। দীর্ঘদিন একই ব্যক্তিকে মিডিয়া বা কার্ড বণ্টনের দায়িত্বে না রেখে নির্দিষ্ট সময় পর পর পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পরিবর্তন করতে হবে।
এই ভয়াবহ সিন্ডিকেট এবং অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা শাহীন হোসেন এবং মুস্তাফিজ খালুর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সুকৌশলে এড়িয়ে যান এবং কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিসিবি সংশ্লিষ্ট মহল এবং গণমাধ্যম জগতে তোলপাড় শুরু হলেও বিসিবির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত কমিটি বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
তবে মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর বিসিবির অভ্যন্তরে কোনো স্বৈরাচারী সিন্ডিকেট বা দোসরদের মনোপলি আর বরদাশত করা হবে না। অবিলম্বে এর সুরাহা না হলে ক্রীড়া সাংবাদিকরা কঠোর কর্মসূচির দিকে যেতে বাধ্য হবেন।

