বাংলাদেশের চক্ষুচিকিৎসা ও অন্ধত্ব প্রতিরোধ আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নাম অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন আর নেই।
লাখো মানুষের চোখে আলো ফিরিয়ে দেওয়া এই মানবিক চিকিৎসক ও সমাজসেবক বার্ধক্যজনিত কারণে আজ শনিবার বেলা ১২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
তাঁর মৃত্যুতে চট্টগ্রামসহ দেশের চিকিৎসা অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (সিইআইটিসি)-এর উপদেষ্টা ও সাবেক ম্যানেজিং ট্রাস্টি হিসেবে তিনি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি, নির্মাণ করেছিলেন দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার এক দীর্ঘ মানবিক আন্দোলন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি দুই পুত্র সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাজীব হোসেন ও রিয়াজ হোসেন, নাতি-নাতনি, আত্মীয়স্বজন এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
মরহুমের প্রথম নামাজে জানাজা আজ ২৭ জুন বাদ এশা চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে।
দ্বিতীয় জানাজা আগামী ২৮ জুন রোববার সকাল ৯টায় চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হবে।
পরে একই দিন বাদ যোহর তাঁর নিজ গ্রাম মিরসরাইয়ের কাঠাছড়ায় তৃতীয় জানাজার পর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
মিরসরাইয়ের সমাজসেবক ডা. আহমেদুর রহমান ও ওয়াহিদুন্নেসার একমাত্র পুত্র অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের জীবন ছিল মানুষের জন্য নিবেদিত এক দীর্ঘ কর্মযজ্ঞ।
স্বাধীনতার পরপরই তিনি উপলব্ধি করেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ চক্ষুচিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত।
সেই ভাবনা থেকেই ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি গঠন করেন।
পরবর্তীতে দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ চক্ষু শিবির পরিচালনার মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখেরও বেশি রোগীর চোখের অপারেশনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়।
গ্রামবাংলার অসংখ্য মানুষ প্রথমবারের মতো তাঁর উদ্যোগে বিশেষায়িত চক্ষুচিকিৎসার সুযোগ পান।
১৯৭৫ সালে তিনি স্কুলগামী শিশুদের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার কর্মসূচি চালু করেন। এ কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ শিক্ষার্থীর চোখ পরীক্ষা করা হয়েছে।
১৯৮৩ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় ১৩০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
সময়ের পরিক্রমায় এটি শুধু দেশের নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম আধুনিক চক্ষুচিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অফথালমোলজি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি পালন করেন মুখ্য ভূমিকা।
এ প্রতিষ্ঠান থেকে ইতোমধ্যে ২৬৬ জন চিকিৎসক স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উদ্যোগে চার বছর মেয়াদি ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন অপটোমেট্রি কোর্স চালু রয়েছে, যা দেশের চক্ষুস্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনবল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের কর্মপরিধি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিস্তৃত ছিল।
তিনি এশিয়া প্যাসিফিক একাডেমি অব অফথালমোলজিতে ২০ বছরেরও বেশি সময় জাতীয় কাউন্সিলর ও আঞ্চলিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেসের চেয়ারম্যান হিসেবে আট বছর দায়িত্ব পালন করে বৈশ্বিক অন্ধত্ব প্রতিরোধ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সম্প্রসারণে তিনি ৩৫০ শয্যাবিশিষ্ট বিশ্বমানের ‘ইম্পেরিয়াল হসপিটাল’ এবং একটি ‘নার্সিং ট্রেনিং সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও বাস্তবায়ন করেন।
মানবকল্যাণ ও চক্ষুচিকিৎসায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু সম্মানে ভূষিত হন।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানির প্রেসিডেন্ট কর্তৃক প্রদত্ত “দ্য অর্ডার অব মেরিট”, ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেসের “দ্য লাইফ লং সার্ভিসেস অ্যাওয়ার্ড”, ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব অফথালমোলজির “কংগ্রেস অব অফথালমোলজি অ্যাওয়ার্ড”, এশিয়া প্যাসিফিক একাডেমি অব অফথালমোলজির “দ্য ডিস্টিংগুইশড সার্ভিসেস অ্যাওয়ার্ড” ও স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড, চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ কমিউনিটি অফথালমোলজি স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টরেট এবং দ্য ডেইলি স্টার অ্যাওয়ার্ড।
তিনি পেনিলপ বিলসন চেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
তাঁদের ভাষায়, তিনি ছিলেন শুধু একজন চিকিৎসক নন; একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, সংগঠক এবং মানবিক নেতৃত্বের প্রতীক।
চোখের আলো ফিরিয়ে দিয়ে যিনি লাখো মানুষের জীবন বদলে দিয়েছিলেন, তাঁর প্রস্থান চিকিৎসা জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান, কর্মযজ্ঞ এবং মানবসেবার দর্শন আগামী প্রজন্মের জন্য পথ দেখাবে বহু বছর।
মানুষের চোখে আলো জ্বালানোর সেই কারিগর আজ নেই। কিন্তু তাঁর ছড়িয়ে দেওয়া আলোর রেখা রয়ে যাবে অসংখ্য মানুষের জীবনজুড়ে।

