জয়ের উল্লাসের মাঝেই ভেঙে পড়ল গোলপোস্ট, নিভে গেল তরুণের জীবন

হালিশহরে মর্মান্তিক মৃত্যু

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই, ২০২৬ ১৫:৩৯

সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই। বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে মাঠে গিয়েছিলেন ২০ বছরের তরুণ মাহিদুল ইসলাম।

ছোট্ট একটি ম্যাচ, কিছু হাসি, কিছু দৌড়, কিছু স্বপ্ন—আর জয়ের আনন্দ ভাগাভাগি করার উচ্ছ্বাস। কে জানত, সেই আনন্দের শেষ দৃশ্যটি হবে এক পরিবারের সারাজীবনের কান্না!

শুক্রবার (৩ জুলাই) সকাল প্রায় ৮টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর থানাধীন বেগমজান উচ্চবিদ্যালয় মাঠে ঘটে হৃদয়বিদারক এই দুর্ঘটনা।

নিহত মাহিদুল ইসলাম পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার কোনোপদিয়া গ্রামের রাসেল গাজীর ছেলে।

জীবিকার তাগিদে তিনি চট্টগ্রাম নগরে বসবাস করতেন। রংমিস্ত্রির কাজ করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি পরিবারের স্বপ্নও বয়ে বেড়াচ্ছিলেন তিনি।

সকালে বন্ধুদের সঙ্গে স্থানীয় বেগমজান উচ্চবিদ্যালয় মাঠে ফুটবল খেলতে যান মাহিদুল। ম্যাচ শেষে তাঁদের দল জয় পায়। জয় মানেই তো উচ্ছ্বাস। বন্ধুদের সঙ্গে সেই আনন্দে মেতে ওঠেন মাহিদুলও।

আনন্দের একপর্যায়ে তিনি গোলপোস্টের ওপরের লোহার ক্রসবারে লাফিয়ে ঝুলে পড়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু দীর্ঘদিনের পুরোনো ও জরাজীর্ণ গোলপোস্টটি তাঁর শরীরের ভার সহ্য করতে পারেনি। মুহূর্তেই সেটি উপড়ে ভেঙে নিচে পড়ে যায়।

কয়েক সেকেন্ড আগেও যেখানে ছিল হাসির শব্দ, সেখানে মুহূর্তেই নেমে আসে আতঙ্ক আর আর্তচিৎকার।

মাহিদুল মাটিতে ছিটকে পড়েন। ভারী লোহার ক্রসবারটি সোজা তাঁর বুকের ওপর আছড়ে পড়ে।

বন্ধুরা ছুটে যান। কেউ গোলপোস্ট সরানোর চেষ্টা করেন, কেউ তাঁকে ডাকতে থাকেন, কেউ আবার সাহায্যের জন্য ছুটে যান।

দুলাভাই মো. রবিউল ও খালাতো ভাই মোহাম্মদ মনির দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।

কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা শুরুর আগেই শেষ হয়ে যায় মাহিদুলের জীবনযুদ্ধ। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী ইনচার্জ সোহেল রানা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, গোলপোস্ট ভেঙে বুকের ওপর পড়ায় গুরুতর আঘাত ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে মাহিদুলের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

একজন রংমিস্ত্রি ছিলেন মাহিদুল। প্রতিদিন রঙের তুলিতে অন্যের ঘরকে সুন্দর করতেন। অথচ নিজের জীবনটা এত দ্রুত রঙহীন হয়ে যাবে, তা হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি।

পটুয়াখালীর কোনোপদিয়া গ্রামে এখন অপেক্ষা করছে একটি পরিবার। হয়তো বাবা রাসেল গাজী ভেবেছিলেন, কাজ শেষে ছেলেটি একদিন বাড়ি ফিরবে। হয়তো আরও অনেক স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু ফিরছে শুধু নিথর দেহ, সঙ্গে অসংখ্য অপূর্ণ স্বপ্ন।

বন্ধুদের মনেও রয়ে যাবে এক অসহনীয় স্মৃতি। যে বন্ধু কয়েক মুহূর্ত আগেও জয়ের আনন্দে হাসছিল, তাকেই কিছুক্ষণের মধ্যে হাসপাতালের পথে ছুটে নিয়ে যেতে হয়েছে।

সেই সকাল, সেই মাঠ, সেই গোলপোস্ট—সবকিছু হয়তো তাঁদের কাছে আজীবন এক দুঃস্বপ্ন হয়ে থাকবে।

একটি ফুটবল ম্যাচের জয় উদযাপন করতে গিয়ে হারিয়ে গেল একটি তরুণ প্রাণ। একটি পরিবারের ভরসা, একজন বাবার স্বপ্ন, বন্ধুদের হাসির সঙ্গী—সবকিছু থেমে গেল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এক দুর্ঘটনায়।

জয় এসেছিল মাঠে। কিন্তু সেই জয়ের মূল্য হয়ে গেল একটি জীবন।

আর হালিশহরের সেই মাঠ নীরবে সাক্ষী হয়ে রইল—একটি উল্লাস কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে রূপ নিতে পারে আজীবনের শোকে।