back to top

প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ প্রাণ ঝরেছে সড়কে, জুনজুড়ে মৃত্যু ৪৩৮ জনের

প্রকাশিত: ০৫ জুলাই, ২০২৬ ০৮:০৪

একটি মাস। মাত্র ৩০ দিন। এই সময়েই দেশের বিভিন্ন সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩৮ জন। আহত হয়েছেন আরও ৫৬১ জন।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৪৪ জন নারী ও ৫৬ জন শিশু। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—মোট নিহতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার।

রোববার প্রকাশিত রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মাসিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং সংস্থাটির নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন মাসে দেশে মোট ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৩৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৬১ জন।

এর মধ্যে ১৪৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৩৪ জন, যা মোট নিহতের ৩০ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে ছিলেন পথচারীরাও। জুনে প্রাণ হারিয়েছেন ৯১ জন পথচারী, যা মোট নিহতের ২০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। একই সময়ে নিহত হয়েছেন ৫৭ জন চালক ও চালকের সহকারী, যা মোট প্রাণহানির ১৩ শতাংশ।

শুধু সড়ক নয়, একই সময়ে দেশের নৌ ও রেলপথেও ঘটেছে প্রাণহানির ঘটনা। ৯টি নৌ-দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৪ জন। অন্যদিকে ২১টি রেলপথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ জন, আহত হয়েছেন ৭ জন।

যানবাহনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের মধ্যে—১৩৪ জন।

এছাড়া থ্রি-হুইলারের যাত্রী ১১২ জন, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ ও ট্রলির আরোহী ৩৭ জন, বাসযাত্রী ২৭ জন, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের আরোহী ১৪ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী ১৫ জন এবং রিকশা ও বাইসাইকেল আরোহী ৮ জন নিহত হয়েছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৭২টি দুর্ঘটনার মধ্যে ১৫১টি ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে, ১৯৪টি আঞ্চলিক সড়কে, ৬৪টি গ্রামীণ সড়কে, ৫৭টি শহরের সড়কে এবং ৬টি অন্যান্য স্থানে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি ২০৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। এছাড়া মুখোমুখি সংঘর্ষে ১০৯টি, পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দিয়ে ৯৭টি, যানবাহনের পেছনে আঘাত করে ৫৩টি এবং অন্যান্য কারণে ৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

জুন মাসে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মোট ৭১৩টি যানবাহন জড়িত ছিল। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ১৫৭টি, থ্রি-হুইলার ১৪১টি, বাস ১১৬টি এবং ট্রাক ১০৭টি।

সময়ভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে। মোট দুর্ঘটনার ৩১ দশমিক ৩৫ শতাংশই ঘটেছে সকাল বেলায়। এছাড়া রাতে ১৯ দশমিক ২৭ শতাংশ, দুপুরে ১৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ, বিকেলে ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং ভোরে ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১১৬টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১৮ জন। প্রাণহানির দিক থেকে এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে নিহত হয়েছেন ১১৩ জন। রাজশাহী বিভাগে প্রাণ হারিয়েছেন ৭৭ জন।

সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে—১৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৬ জন। রাজধানী ঢাকায় ৩২টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত এবং ৪৯ জন আহত হয়েছেন।

নিহতদের পেশাগত পরিচয়ও দুর্ঘটনার বহুমাত্রিক প্রভাবের চিত্র তুলে ধরেছে। প্রাণ হারানোদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৮ জন শিক্ষার্থী, ২৪ জন ব্যবসায়ী, ২১ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ১৯ জন বিক্রয় প্রতিনিধি, ১৭ জন এনজিও কর্মী, ১৩ জন ব্যাংক ও বীমা কর্মকর্তা-কর্মচারী, ৬ জন পোশাক শ্রমিক, ৫ জন নির্মাণ শ্রমিক, ৪ জন শিক্ষক, ৪ জন আইনজীবী, ৪ জন মসজিদের ইমাম বা খাদেম, ৩ জন প্রকৌশলী, ২ জন সাংবাদিক, ২ জন প্রতিবন্ধী, ১ জন পুলিশ সদস্য, ১ জন চিকিৎসক এবং ১ জন চীনা নাগরিক।

প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও বেতনের অভাব, মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজির বিষয়গুলোকে দায়ী করা হয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যা শেষ পর্যন্ত একটি মানুষের জীবন, একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি—এ কথাই যেন আবারও মনে করিয়ে দিল জুন মাসের এই নির্মম হিসাব।