back to top

অবশেষে হাসল মা, হাসল মানবতা!

প্রকাশিত: ০৯ জুলাই, ২০২৬ ১১:২৪

ভোর তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। চারদিকে শুধু থইথই পানি। বাড়ির সামনের রাস্তা কোথায় শেষ হয়েছে, আর কোথা থেকে জলরাশি শুরু হয়েছে-তা বোঝার উপায় নেই।

গলাসমান পানিতে ডুবে আছে পুরো পথ। এমন দুর্যোগের মধ্যেই হঠাৎ প্রসববেদনা ওঠে ২২ বছর বয়সী গৃহবধূ মিজবাহুল জান্নাতের।

পরিবারের সদস্যরা একদিকে তাঁর যন্ত্রণায় অসহায়, অন্যদিকে চারপাশের বন্যার পানিতে অবরুদ্ধ। হাসপাতালে নেওয়ার মতো কোনো পথ নেই, কোনো যানবাহনও পৌঁছাতে পারছে না।

অবশেষে একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে ফায়ার সার্ভিস। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টার দিকে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পশ্চিম আমিরাবাদ ইউনিয়নের খৈয়ারকুল গ্রামে ঘটে হৃদয়স্পর্শী এই ঘটনা।

ডলু নদের তীরবর্তী খৈয়ারকুল গ্রামটি গত কয়েক দিনের অতি ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে।

সেই পানিবন্দী গ্রাম থেকেই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মিজবাহুল জান্নাতকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌঁছে দেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

পরে তিনি একটি সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। বর্তমানে মা ও নবজাতক দুজনই সুস্থ আছেন। এই একটি জন্ম যেন দুর্যোগের অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো হয়ে উঠেছে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে মিজবাহুল জান্নাতের প্রসববেদনা শুরু হয়। তাঁর বাড়ি থেকে উপজেলা সদরের হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার।

সাধারণ সময়ে এই পথ পাড়ি দিতে খুব বেশি সময় লাগে না। কিন্তু টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল আর উপচে পড়া নদীর পানিতে পুরো সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় হাসপাতালের পথ হয়ে ওঠে প্রায় অসম্ভব।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রসবযন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন তিনি। পরিবারের সদস্যরা একের পর এক সম্ভাব্য উপায় খুঁজতে থাকলেও কোনো সমাধান মিলছিল না।

শেষ পর্যন্ত ভোরের দিকে তাঁরা লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনে খবর দেন।

খবর পেয়েই উদ্ধার অভিযানে নামে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল।

লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা রাখাল চন্দ্র রুদ্র জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে যায়। প্রায় দেড় ঘণ্টার অভিযানে মিজবাহুল জান্নাতকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

তিনি বলেন, স্থানীয় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্টেশনে আগে থেকেই একটি অ্যাম্বুলেন্স রাখা হয়েছিল।

কিন্তু স্টেশন থেকে তাঁর শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব প্রায় ৬০০ মিটার হলেও পুরো পথই ছিল পানির নিচে।

ফলে স্ট্রেচারে করে তাঁকে কাঁধে বহন করে উদ্ধারকর্মীরা গলাসমান পানি পেরিয়ে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত নিয়ে যান। সেখান থেকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়।

মানবিক দায়িত্ব আর পেশাগত নিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ফায়ার সার্ভিসের এই অভিযান শেষ হয় হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে নবজাতকের প্রথম কান্নার মধ্য দিয়ে।

তবে এই একটি সুখবরের আড়ালে লুকিয়ে আছে বৃহত্তর এক দুর্যোগের চিত্র।

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ডলু, সাঙ্গু ও টঙ্কাবতী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় সাতকানিয়া অংশে সাঙ্গু নদের পানি বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ডলু নদ ও টঙ্কাবতী নদীর পানিও আগেই বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, গত রাত থেকেই সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার সব ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা সদর, ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়কের অধিকাংশই পানির নিচে চলে যাওয়ায় যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

কয়েক লাখ মানুষ এখন পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষায়, অনেকের ঘরে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

এদিকে বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

পাউবোর চট্টগ্রাম উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার জানান, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

তাই পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থানের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

প্রকৃতির ভয়াল রূপের সামনে মানুষ অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ে। তবু সেই অসহায়তার মধ্যেও কিছু গল্প থেকে যায়, যা সাহস, দায়িত্ববোধ আর মানবতার নতুন সংজ্ঞা লিখে দেয়।

লোহাগাড়ার বন্যাকবলিত খৈয়ারকুল গ্রামের এই ঘটনাও তেমনই একটি গল্প-যেখানে গলাসমান পানি হার মানিয়েছে মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে, যেখানে স্ট্রেচারে কাঁধে তুলে নেওয়া এক মায়ের জীবনযুদ্ধ শেষ হয়েছে একটি নবজাতকের প্রথম কান্নায়, যেখানে বন্যার বুক চিরে জন্ম নিয়েছে নতুন এক জীবনের, নতুন এক আশার।