টানা কয়েক দিনের রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম। নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকলেও পরিস্থিতিকে আতঙ্কের নয়, বরং একটি ব্যতিক্রমী প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
তাঁর ভাষায়, এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, মানবিকতা এবং নাগরিক সচেতনতা।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে গঠিত ১৯ সদস্যবিশিষ্ট সমন্বয় কমিটির জরুরি সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে মেয়র বলেন, গত চার থেকে পাঁচ দিনে চট্টগ্রামে প্রায় এক হাজার মিলিমিটারের কাছাকাছি বৃষ্টিপাত হয়েছে।
এর মধ্যে একদিনেই ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসেও অন্যতম সর্বোচ্চ। তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক শহরে পুরো বছরেও এত বৃষ্টিপাত হয় না। তাই এই দুর্যোগের বাস্তবতা সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে।
মেয়র জানান, বৃষ্টি এখনও অব্যাহত রয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনও ভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে কোথাও যেন মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
বিশেষ করে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে বারবার।
তবে বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। অনেক পরিবার শেষ সম্বল হারানোর আশঙ্কায় পাহাড়ি এলাকা ছেড়ে যেতে চায় না।
শুধু প্রশাসনিক নির্দেশে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, মানুষের আস্থা অর্জন করে তাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার ভূমিকার প্রশংসা করে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, ওয়াসা, সিডিএসহ সংশ্লিষ্ট সবাই দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করছেন।
কোথায় কেন পানি জমে আছে, তার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মেয়র বলেন, বিভিন্ন এলাকায় পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, অতীতে দখল, ভরাট এবং অবৈজ্ঞানিক স্থাপনা নির্মাণের কারণে বহু খাল ও ড্রেন সংকুচিত হয়ে গেছে।
কোথাও খালের ওপর স্থাপনা, কোথাও গরুর খামার, আবার কোথাও ড্রেনের মুখ বন্ধ করে ফুটপাত নির্মাণের কারণে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে খাল ও ড্রেনের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে।
এ সময় সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের চলমান কার্যক্রমেরও ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
তাঁর মতে, খাল পুনরুদ্ধার ও প্রশস্ত করার এ উদ্যোগ না থাকলে এবারের রেকর্ড বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারত।
ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, ২০২৫ সালে ধারাবাহিকভাবে খাল-নালা পরিষ্কার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে নগরীর প্রায় ৬০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব হয়েছে।
একসময় বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, জিইসি মোড়, চকবাজার, দুই নম্বর গেট ও বাকলিয়াসহ যেসব এলাকায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকত, বর্তমানে সেখানে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, হিজড়া খাল, জামালখান খাল, রামপুরা খাল, বামনশাহী খাল ও আজব বাহার খালসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খালের কাজ বর্ষার কারণে সাময়িকভাবে ধীরগতিতে চলছে।
বর্ষা শেষে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে এসব কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে আরও ৪০টি খাল পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের হলেও অতীতে নানা কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন মেয়র।
তিনি বলেন, বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে খালগুলোর টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও অর্থায়নের বিষয়েও পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “আমরা জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই-এটি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আমরা সবাই মিলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছি।
যেসব এলাকায় এখনও মানুষ পানিবন্দি আছেন, তাদের দুর্ভোগের জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
মানবিক দায়িত্ব থেকে আমরা তাদের পাশে আছি এবং পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
একই সঙ্গে তিনি নাগরিক দায়িত্ববোধের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
খাল, নালা ও ড্রেনে প্লাস্টিক, পলিথিন ও ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক জলাবদ্ধতার জন্য আমাদের নিজেদের অসচেতনতাও দায়ী।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিও দায়িত্বশীল ভূমিকার আহ্বান জানান মেয়র। তিনি বলেন, দুর্যোগের সময় সঠিক ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা হলে জনগণ যেমন সঠিক বার্তা পায়, তেমনি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাজও আরও গতিশীল হয়।
সমন্বিত পরিকল্পনা, চলমান উন্নয়ন প্রকল্প এবং নাগরিকদের সহযোগিতার মাধ্যমে চট্টগ্রামকে ধীরে ধীরে জলাবদ্ধতামুক্ত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করা সম্ভব হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

