লালদিয়াচর টার্মিনাল নিয়ে সংসদে যা জানাল সরকার

প্রকাশিত: ১৩ জুলাই, ২০২৬ ২১:৫০

চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়াচর কন্টেইনার টার্মিনাল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা চলছে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার প্রথমবারের মতো সংসদে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিল-ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে করা কনসেশন চুক্তি বাতিল কিংবা পুনঃচুক্তির কোনো পরিকল্পনা নেই।

সোমবার (১৩ জুলাই) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) আইন ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) কাঠামোর আওতায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে।

ফলে এটি বাতিল বা পুনর্বিবেচনার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।

সরকারের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে-লালদিয়াচর প্রকল্পে সরকারের অবস্থান এখন দৃঢ়। তবে একই সঙ্গে সামনে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এত বড় একটি অবকাঠামো প্রকল্পে শুধু বিনিয়োগের অঙ্কই নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপ কতটা স্বচ্ছ ছিল এবং ভবিষ্যতে বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে কীভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে-সেটিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সংসদে নৌমন্ত্রী জানান, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ২০২১ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের মধ্যে প্রথম সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

এরপর ২০২৩ সালের ২১ মে ডেনমার্কভিত্তিক মার্স্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস কর্ণফুলী নদীর ডান তীরে লালদিয়াচর এলাকায় কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়ক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রকল্পটিকে নীতিগত অনুমোদন দেয়।

পরে ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ-ডেনমার্ক প্রথম পিপিপি জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম সভায় ডেনমার্ক সরকার এপিএম টার্মিনালসের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চূড়ান্ত সম্মতি জানায়।

এরপর ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ট্রানজ্যাকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে ডিউ ডিলিজেন্স ও প্রয়োজনীয় আইনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে।

সব প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও এপিএমটি বিভির মধ্যে কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

নৌমন্ত্রী জানান, চুক্তির মোট মেয়াদ ৩৩ বছর। এর মধ্যে প্রথম তিন বছর নির্মাণকাল এবং পরবর্তী ৩০ বছর পরিচালনাকাল।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ভবিষ্যতে আরও ১৫ বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগও রাখা হয়েছে। প্রকল্পটিতে এপিএম টার্মিনালস ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে।

সরকারের প্রত্যাশা, এই বিনিয়োগের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এত দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চমূল্যের একটি আন্তর্জাতিক কনসেশন চুক্তি স্বাভাবিকভাবেই জনস্বার্থের প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।

প্রকল্পের অগ্রগতি, বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, পরিবেশগত প্রতিশ্রুতি, চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে-এসব বিষয় নিয়ে ভবিষ্যতেও জনপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

কারণ অবকাঠামো প্রকল্পের সাফল্য কেবল চুক্তি স্বাক্ষরে নয়; এর প্রকৃত মূল্যায়ন হয় বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থ কতটা নিশ্চিত হয়, তার ওপর।