back to top

সাদা মাইক্রোবাস থেকে বোর্ডরুম-অপহরণ করে ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ

এস আলমের নির্দেশে এসআইবিএল দখল!

প্রকাশিত: ১২ মে, ২০২৬ ০৯:৩৭

চারপাশে নিস্তব্ধতা। ভোরের আলো মাত্র ছুঁয়ে গেছে রাজধানীর রাস্তা। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর, ফজরের নামাজ শেষে প্রতিদিনের মতো হাঁটতে বের হয়েছিলেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল)-এর স্বতন্ত্র পরিচালক আব্দুর রহমান। কিন্তু সেই দিনের সকালটি ছিল ভিন্ন—এবং ভয়াবহ।

বারিধারা ডিওএইচএস থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি নম্বরবিহীন সাদা মাইক্রোবাস এসে থামে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চারজন শক্তপোক্ত ব্যক্তি তাকে ঘিরে ফেলে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নেয়। কোনো প্রতিরোধের সুযোগই ছিল না।

প্রায় একই সময়ে, উত্তরা এলাকায় বোর্ড সচিব হুমায়ুন কবিরের বাসায় হাজির হয় সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি। নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে তারা তাকে সঙ্গে যেতে বাধ্য করে। স্ত্রীর বাধা উপেক্ষা করে তাকে জোর করে তুলে নেওয়া হয়।

সেদিন ভোর থেকে দুপুরের আগেই রাজধানীর বারিধারা, উত্তরা, গুলশান, মিরপুর, জিগাতলা, মগবাজার, বনানী ও তেজকুনিপাড়া থেকে এসআইবিএলের মোট আটজন কর্মকর্তা ও পরিচালককে একইভাবে তুলে নেওয়া হয়।

কেউ হাঁটছিলেন, কেউ গোসল করছিলেন, কেউ সন্তানকে স্কুলে নিতে প্রস্তুত হচ্ছিলেন—কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই পৌঁছান এক জায়গায়—ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কচুক্ষেতে অবস্থিত একটি গোয়েন্দা কার্যালয়ে।

সেখানে তাদের রাখা হয় আলাদা কক্ষে। কেউ জানতেন না, অন্যরাও একই পরিণতির শিকার হয়েছেন। একই সময় তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মতিঝিলের সিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিতব্য ব্যাংকের ৪০৪তম বোর্ড সভার জন্য। কিন্তু বাস্তবে, সেই সভার নিয়ন্ত্রণ ইতোমধ্যেই চলে গিয়েছিল অন্য হাতে।

দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভুক্তভোগীরা জানান, ওই গোয়েন্দা কার্যালয়ের ভেতরেই উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম। তিনি সেখানে এমনভাবে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন, যেন পুরো প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক তিনিই।

বোর্ড সচিব হুমায়ুন কবিরের হাতে তুলে দেওয়া হয় তিনটি প্রস্তুত পদত্যাগপত্র—চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যানের। পরে জানা যায়, এসব পদত্যাগপত্র সাদা কাগজে জোর করে নেওয়া স্বাক্ষরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

অন্যদিকে, একই কার্যালয়ে বসে এক জুনিয়র কর্মকর্তা আব্দুর রহমানকে দিয়ে তৈরি করানো হয় বোর্ড সভার কার্যবিবরণী, নতুন নিয়োগের নথি এবং পদত্যাগ অনুমোদনের কাগজপত্র।

সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর বোর্ড সভার স্থান পরিবর্তন করে মতিঝিল থেকে হোটেল ওয়েস্টিনে নেওয়া হয়। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে শুরু হওয়া সেই সভা মাত্র ৩০ মিনিটে শেষ হয়—যেখানে আগেই নির্ধারিত সিদ্ধান্তগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে পাস করা হয়।

সেই সভায় চেয়ারে বসেন নতুন চেয়ারম্যান, নিয়োগ পান নতুন এমডি ও নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান—সবই পূর্বনির্ধারিত। পরিচালকরা তখনও আতঙ্কে, অনেকেই সাধারণ পোশাকে, যাদের জন্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফরমাল পোশাক পর্যন্ত জোগাড় করা হয়েছিল।

এরপর শুরু হয় আরেক ধাপ—বাংলাদেশ ব্যাংকের তড়িঘড়ি অনুমোদন। সাধারণ নিয়ম ভেঙে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়।

এর কয়েক মাসের মধ্যেই ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে যায় এস আলম গ্রুপের হাতে। শুরু হয় বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ—যার বড় অংশ যায় এস আলম সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কাছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ ব্যাংকটির মোট ঋণ দাঁড়ায় ৩৭ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা যায় এস আলম গ্রুপে। খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা—মোট ঋণের ৬২ শতাংশের বেশি। মূলধনও হয়ে পড়ে ঋণাত্মক।

অবশেষে এই বেপরোয়া ঋণ বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার ফলে এসআইবিএল তীব্র তারল্য সংকটে পড়ে এবং ২০২৫ সালে আরও চারটি দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ছিল নজিরবিহীন ঘটনা। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কে মুজেরির ভাষায়, একটি ব্যাংক দখলের জন্য রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা “অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক”।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ভুক্তভোগীরা এক কথায় বলেছেন—সেদিনের পুরো প্রক্রিয়া একজনকে ঘিরেই পরিচালিত হচ্ছিল, আর তিনি ছিলেন এস আলম। পুরো প্রতিবেদন পড়তে লিংকে ক্লিক করুন, দ্য ডেইলি স্টার

ভোরের সেই নিস্তব্ধ সকাল থেকেই শুরু হয়েছিল এক নীরব অপারেশন—যার পরিণতিতে বদলে যায় একটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ, আর উন্মোচিত হয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, করপোরেট স্বার্থ ও প্রভাবের এক ভয়ংকর সমীকরণ।