back to top

‘৩০ বিলিয়ন ডলার পাচারের’ অভিযোগে বিএটিবিসির নথি তলব, অনুসন্ধানে দুদক

‘জাল কাগজপত্রে বহাল রাখা হয় বিএটির মালিকানা’

প্রকাশিত: ২৪ মে, ২০২৬ ১৫:৪৭

স্বাধীনতার পর যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ হিসেবে রাষ্ট্রের মালিকানায় যাওয়ার কথা ছিল, তার একটি কি থেকে গেছে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে?

এই প্রশ্ন ঘিরেই এবার অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে দেশের শীর্ষ বহুজাতিক তামাক কোম্পানি—ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড (বিএটিবিসি)।

‘মালিকানা জালিয়াতির মাধ্যমে ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার’—এমন বিস্ফোরক অভিযোগের অনুসন্ধানে কোম্পানিটির বিভিন্ন নথি তলব করেছে দুদক।

একই সঙ্গে চিঠি দেওয়া হয়েছে যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরকেও (আরজেএসসি)। আগামী ১৫ জুনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব নথির সত্যায়িত অনুলিপি জমা দিতে বলা হয়েছে।

দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম শনিবার গণমাধ্যমকে বলেন, অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। তবে অনুসন্ধানের স্বার্থে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

অনুসন্ধানের দায়িত্ব পেয়েছেন দুদকের সহকারী পরিচালক সাজিদ-উর-রোমান। দায়িত্ব পাওয়ার পরই তিনি বিএটিবিসি, বাংলাদেশ টোবাকো কোম্পানি, পাকিস্তান টোবাকো কোম্পানি এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোর নিবন্ধনসংক্রান্ত বিস্তৃত নথি তলব করেন।

বর্তমানে দেশের দুই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিএটিবিসির পরিশোধিত মূলধন ৫৪০ কোটি টাকা।

কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৭১ দশমিক ৯১ শতাংশ উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে, শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ সরকারের কাছে এবং বাকি অংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানায় রয়েছে।

কিন্তু দুদকে জমা পড়া অভিযোগ বলছে, এই মালিকানার ভিত্তিতেই রয়েছে বড় ধরনের জালিয়াতি।

অভিযোগ অনুযায়ী, পাকিস্তান আমেরিকান টোবাকো (পিএটি) ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রামে এবং ১৯৬৫ সালে ঢাকায় কারখানা স্থাপন করে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই দুই কারখানা ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চলে যাওয়ার কথা ছিল।

অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, পিএটির ১৯৭২, ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে তাদের দুটি কারখানা হারানোর বিষয়টিও উল্লেখ ছিল।

শুধু তা-ই নয়, সেই তথ্যের ভিত্তিতে পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে কর ছাড় ও ক্ষতিপূরণও নেওয়া হয়।

কিন্তু এরপরই শুরু হয় অন্য খেলা—এমন অভিযোগ দুদকে জমা পড়া নথিতে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, জাল কাগজপত্র তৈরি ও প্রভাব খাটিয়ে কোম্পানিটিকে বাংলাদেশে নিবন্ধিত দেখানো হয়।

এর মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুই কারখানাসহ পুরো ব্যবসার মালিকানা কার্যত বহাল থাকে ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোর নিয়ন্ত্রণে।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, সাবেক পাকিস্তান আমেরিকান টোবাকোর এক ফাইন্যান্স ম্যানেজার কয়েকজন মন্ত্রী, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে এই নথি তৈরি ও দাখিলে ভূমিকা রাখেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, আরজেএসসি প্রথমে আপত্তি তুললেও প্রভাবশালীদের চাপে শেষ পর্যন্ত সেই নথি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গত কয়েক দশকে কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত অভিযোগ আড়াল করতে সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সাবেক সচিবদের কোম্পানির বোর্ডে নিয়োগ বা মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের লাভজনক এজেন্সি ব্যবসার মাধ্যমে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

এই অভিযোগকে “বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং” বলেও উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগপত্রে।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদক যে নথিগুলো চেয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন, আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন, সার্টিফিকেট অব ইনকরপোরেশন, মালিকানার বিবরণ, পরিচালকদের তালিকা, শেয়ার কাঠামো
অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধনের তথ্য, কারখানার তালিকা, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা-সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র।

এছাড়া পাকিস্তানের করাচিতে থাকা পাকিস্তান টোবাকো কোম্পানির ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন সংগ্রহের সুপারিশও করা হয়েছে।

এজন্য ইসলামাবাদে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং করাচিতে কনস্যুলেটের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে অভিযোগে।

দুদকের এই অনুসন্ধান এখন কেবল একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত নয়; বরং স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় সম্পদের মালিকানা, বিদেশি করপোরেট প্রভাব এবং কয়েক দশকের আর্থিক লেনদেনের এক অন্ধকার অধ্যায়ের দিকেও নতুন করে আলো ফেলছে।

অভিযোগের বিষয়ে বিএটিবিসির বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে শুরুতে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গণমাধ্যমবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান যোগাযোগ করবে।

পরে বিবৃতি দেওয়ার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।