back to top

বিএসবিআরএতে অযোগ্য, চট্টগ্রাম চেম্বারে সহ-সভাপতি-কীভাবে উঠলেন আমজাদ চৌধুরী?

প্রকাশিত: ২৬ মে, ২০২৬ ১০:১৬

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন শিল্পপতি ও রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমজাদ হোসেন চৌধুরী।

এই ব্যবসায়ী সম্প্রতি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তার অতীত আর্থিক অনিয়ম, ঋণ খেলাপি এবং দুর্নীতি মামলার বিষয়গুলো আবারও সামনে এসেছে।

ব্যবসায়ী মহলের প্রশ্ন—যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপির অভিযোগ রয়েছে, যিনি একাধিক ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাৎ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি ছিলেন, তিনি কীভাবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বের অংশ হয়ে উঠলেন?

এক সংগঠনে অযোগ্য, অন্য সংগঠনে নির্বাচিত:
এর আগে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)-এর নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছিলেন আমজাদ হোসেন চৌধুরী।

বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের অভিযোগে তার প্রার্থিতা নিয়ে আপত্তি ওঠে। নির্বাচন বোর্ডে শুনানি হয়, পর্যালোচনা করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাদায়ী ঋণের প্রতিবেদনও।

সেই প্রতিবেদনে উঠে আসে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণের তথ্য। পরে নির্বাচন আপিল বোর্ড আর্থিক দায়-দেনা ও ঋণ খেলাপির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তার প্রার্থিতা বাতিল করে।

বিএসবিআরএ নির্বাচন বোর্ডের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, সংগঠনের নেতৃত্বে আর্থিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ ব্যক্তির থাকা জরুরি।

ঋণ খেলাপির অভিযোগ থাকা কেউ সভাপতি হলে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, যে অভিযোগে একটি সংগঠন তাকে অযোগ্য ঘোষণা করল, সেই একই অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি চট্টগ্রাম চেম্বারের মতো প্রভাবশালী সংগঠনের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হলেন?

রাইজিং গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির বিস্তৃতি :
তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাইজিং গ্রুপের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আমজাদ হোসেন চৌধুরী। ২০১৩ সালের পর থেকে গ্রুপটির একের পর এক প্রতিষ্ঠান ঋণ খেলাপিতে জড়িয়ে পড়ে।

বর্তমানে ১৯টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাইজিং গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা এবি ব্যাংক চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখা থেকে নেওয়া ৩২৫ কোটি টাকার ঋণ।

রাইজিং স্টিল পুরোনো জাহাজ আমদানির জন্য ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে তিনটি এলসির বিপরীতে এই ঋণ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, ঋণের অর্থ যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়নি এবং তা আত্মসাৎ করা হয়।

এ ঘটনায় ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপসহকারী পরিচালক মানিকলাল দাশ বাদী হয়ে ডবলমুরিং থানায় মামলা করেন।

মামলায় আসামি করা হয় আমজাদ হোসেন চৌধুরী, জসীম চৌধুরীসহ বাংলাদেশ ব্যাংক ও এবি ব্যাংকের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাকে।

শুধু এবি ব্যাংক নয়, একই বছরের ২৬ ডিসেম্বর সাউথইস্ট ব্যাংকের হালিশহর শাখা থেকে ১৪৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ঋণ আত্মসাতের অভিযোগেও আরেকটি মামলা হয়।

১৫ মামলার আসামি, ছিল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা:
দুদক সূত্র অনুযায়ী, অর্থ আত্মসাৎ ও ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় আমজাদ হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মোট ১৫টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়। এসব মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছিল।

একপর্যায়ে তিনি ও তার ভাই জসীম চৌধুরী দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানিয়েছিল।

২০২১ সালের ২৬ জানুয়ারি দুদকের মানি লন্ডারিং শাখা আমজাদ হোসেন চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেশের সব বন্দরে চিঠি পাঠায়।

পরের বছর ২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে বিদেশে পালানোর সময় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক হন আমজাদ। পরে তাকে আদালতে পাঠানো হলে আদালত জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এরও এক বছর পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের আরেক ভাই ব্যবসায়ী জসীম উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৭। তার বিরুদ্ধেও চট্টগ্রাম ও ঢাকায় একাধিক মামলা ছিল বলে জানিয়েছিল র‌্যাব।

রাজনৈতিক পালাবদল, বদলে যায় বাস্তবতা :
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। এরপর ঋণ খেলাপি অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া রাইজিং গ্রুপের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একে একে জামিনে মুক্তি পান।

বর্তমানে আমজাদ হোসেন চৌধুরী চট্টগ্রাম চেম্বারের সহ-সভাপতি—এই বাস্তবতা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ব্যবসায়ী নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও জবাবদিহি নিয়ে।

ব্যবসায়ী সমাজে বাড়ছে প্রশ্ন:
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজের একটি বড় অংশ মনে করছে, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনে আর্থিক স্বচ্ছতা ও ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

তাদের মতে, ঋণ খেলাপি বা আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ থাকা ব্যক্তিরা যদি সহজেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন, তাহলে পুরো ব্যবসায়ী সমাজের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নির্বাচন কি সত্যিই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে হচ্ছে, নাকি প্রভাব ও রাজনৈতিক শক্তিই হয়ে উঠছে মূল নিয়ামক?

তবে এসব অভিযোগ ও বিতর্কের বিষয়ে এখন পর্যন্ত মো. আমজাদ হোসেন চৌধুরীর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, অভিযোগগুলোর বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা না এলে বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে।