এক যুগ পর আবারও ভোটের উত্তাপে ফিরেছে চট্টগ্রামের ব্যবসাঙ্গন। দীর্ঘ আইনি জটিলতা, পাল্টাপাল্টি রিট, স্থগিতাদেশ ও শেষ মুহূর্তের নাটকীয় বর্জনের মধ্য দিয়েও শনিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন।
নগরের আগ্রাবাদে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে সকাল থেকেই ভোটারদের ভিড় প্রমাণ করেছে—দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ব্যবসায়ীরা এবার নেতৃত্ব বেছে নিতে মরিয়া। সকাল ৯টায় ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই কেন্দ্রের সামনে জড়ো হন শত শত ভোটার। চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ।
২০১৩ সালের পর এই প্রথম চেম্বারে সরাসরি ভোট হচ্ছে। এর পরবর্তী সব কমিটি গঠিত হয়েছিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ফলে এবারের নির্বাচনকে শুধু নেতৃত্ব নির্বাচন নয়, ব্যবসায়ীদের বহুদিনের জমে থাকা অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
তবে ভোটের দিন পর্যন্ত পৌঁছাতে চেম্বারকে পাড়ি দিতে হয়েছে টানটান অনিশ্চয়তার পথ। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গত বছরের ১ নভেম্বর ভোট হওয়ার কথা থাকলেও ট্রেড গ্রুপ ও টাউন অ্যাসোসিয়েশন শ্রেণি বাদ দেওয়া নিয়ে শুরু হয় বিরোধ। বিষয়টি গড়ায় এফবিসিসিআইয়ের সালিসি ট্রাইব্যুনাল ও উচ্চ আদালত পর্যন্ত।
এরপর একের পর এক রিট, আদালতের আদেশ, স্থগিতাদেশ ও নতুন তফসিলের নির্দেশনায় প্রায় অচল হয়ে পড়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া। জাতীয় নির্বাচন, সুপ্রিম কোর্টের শুনানি, সালিসি ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনা—সব মিলিয়ে কয়েক দফা পেছাতে থাকে ভোট। প্রায় ২০ মাস নেতৃত্বশূন্য থাকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী সংগঠনটি।
সবশেষে গত বৃহস্পতিবার আবারও হাইকোর্টে রিট করেন সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদের নেতা এস এম নুরুল হক ও মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম। আদালত ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দিলেও একই দিন বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত সেই আদেশ স্থগিত করে নির্বাচন আয়োজনের পথ খুলে দেয়। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই শুক্রবার নির্বাচনকে “প্রহসনের” আখ্যা দিয়ে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয় সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ।
র্যাডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলনেতা এস এম নুরুল হক অভিযোগ করেন, এফবিসিসিআইয়ের সালিসি ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনা ও বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা অনুসরণ না করেই তড়িঘড়ি নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে।
তাঁর ভাষায়, আদালতের চূড়ান্ত শুনানির আগেই ভোট আয়োজন “বেআইনি, পক্ষপাতমূলক ও প্রহসনের।”
তবে সময়মতো প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদের প্রার্থীদের নাম ব্যালটে থেকেই যায়। ফলে ভোট বর্জনের ঘোষণা এলেও নির্বাচনী লড়াইয়ের আনুষ্ঠানিক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে।
এবারের নির্বাচনে মুখোমুখি হয় দুটি প্যানেল—এস এম নুরুল হকের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ এবং এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আমিরুল হকের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম।
সাধারণ শ্রেণিতে ৩৭ জন এবং সহযোগী শ্রেণিতে ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া ট্রেড গ্রুপ ও টাউন অ্যাসোসিয়েশন থেকে ছয়জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পথে রয়েছেন।
চেম্বারের মোট ভোটার ৬ হাজার ৭৮০ জন। এর মধ্যে সাধারণ সদস্য ৪ হাজার ১ জন এবং সহযোগী সদস্য ২ হাজার ৭৬৪ জন। একজন সাধারণ শ্রেণির ভোটার ১২টি এবং সহযোগী শ্রেণির ভোটার ৬টি ভোট দিতে পারছেন।
ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, শুধু ছোট ব্যবসায়ী নন, বড় শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত হয়েছেন ভোট দিতে। সাবেক পরিচালক ও সভাপতিরাও এসেছেন ভোটারদের উৎসাহ দিতে। ১৭টি বুথে শান্তিপূর্ণভাবে চলে ভোটগ্রহণ।
ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামের দলনেতা আমিরুল হক বলেন, ব্যবসায়ীরা ভোটের মাধ্যমেই তাঁদের নেতৃত্ব নির্ধারণ করতে চান। এক যুগ পর ভোটারদের উপস্থিতি সেটিই প্রমাণ করেছে।
নির্বাচনী বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোয়ারা বেগম দাবি করেন, আদালতের নির্দেশনা ও আইনগত মতামত মেনেই নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছে।
অন্যদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সুব্রত বিশ্বাস দাস জানান, উৎসবমুখর পরিবেশে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলছে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহলের বড় অংশের প্রত্যাশা—দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও আদালতনির্ভর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এবার কার্যকর নেতৃত্ব পাবে চেম্বার।
কারণ, দেশের প্রধান বন্দরনগরীর ব্যবসায়িক হৃদস্পন্দন হিসেবে পরিচিত এই সংগঠনের স্থবিরতা শুধু চেম্বারের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তার প্রভাব পড়েছে বৃহত্তর বাণিজ্য পরিবেশেও।

