সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন বাবা ও ছেলে। হয়তো সামনে ছিল দিনের পরিকল্পনা, পরিবারের জন্য কিছু স্বপ্ন, কিছু দায়িত্ব। কিন্তু কে জানত, কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার আগেই মৃত্যুর নির্মম থাবা গ্রাস করবে দু’জনকেই!
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার পাইন্দং ইউনিয়নের আমতল এলাকায় সোমবার (১ জুন) সকাল ১০টার দিকে ঘটে যায় এমন এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা, যা মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দেয় পুরো জনপদকে।
দ্রুতগতির একটি বিআরটিসি বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান মুহাম্মদ শাহজাহান (৪৪) ও তাঁর ছেলে মুহাম্মদ আরিফ (১৮)।
আরও পড়ুন
চোখের সামনে বাবা-ছেলের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা। সেই ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে বাসটিতেও।
কয়েক সেকেন্ডে শেষ হয়ে গেল দুটি জীবন
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক ধরে চট্টগ্রাম শহরের দিকে যাচ্ছিল বিআরটিসির একটি বাস।
পাইন্দং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের আমতল এলাকায় পৌঁছানোর পর দ্রুতগতির বাসটি মোটরসাইকেলটিকে সজোরে চাপা দেয়।
সংঘর্ষ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে মোটরসাইকেলে থাকা বাবা-ছেলের আর বাঁচার সুযোগ মেলেনি। মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে সড়কে লুটিয়ে পড়েন তাঁরা। স্থানীয়রা ছুটে এলেও ততক্ষণে সব শেষ।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “শব্দটা ছিল বিকট। আমরা দৌড়ে গিয়ে দেখি মোটরসাইকেল দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। বাবা-ছেলে দুজনই তখন নিথর।”
মৃত্যুর সঙ্গে ধাক্কা খেল অটোরিকশাও
মোটরসাইকেলকে চাপা দেওয়ার পর একই সময়ে একটি অটোরিকশার সঙ্গেও সংঘর্ষ হয় বাসটির। এতে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। সড়কজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। চারদিকে শুরু হয় চিৎকার, কান্না আর বিশৃঙ্খলা।
দুর্ঘটনার ভয়াবহতা দেখে অনেকেই হতবাক হয়ে পড়েন। স্থানীয়দের দাবি, বাসটির গতি ছিল অত্যন্ত বেশি, যা এমন মর্মান্তিক পরিণতির অন্যতম কারণ হতে পারে।
ক্ষোভ যখন আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে
রক্তাক্ত সড়কে বাবা-ছেলের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। কিছুক্ষণের মধ্যেই শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হন।
বিক্ষুব্ধ জনতা বিআরটিসি বাসটি আটক করে। পরে বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখায় গ্রাস হতে থাকে যানটি। কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আশপাশের এলাকা।
স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, এটি শুধু একটি দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ নয়; দীর্ঘদিন ধরে সড়কে বেপরোয়া গতিতে যান চলাচল, অসচেতন চালনা এবং নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিস
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে ততক্ষণে বাসটির বড় একটি অংশ পুড়ে যায়।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের যৌথ চেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও এলাকায় উত্তেজনা দীর্ঘ সময় ধরে বিরাজ করে।
থমকে যায় মহাসড়ক
দুর্ঘটনার পর চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কে যান চলাচল প্রায় এক ঘণ্টার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। শত শত যাত্রী দুর্ভোগে পড়েন।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে এবং যান চলাচল পুনরায় শুরু হয়।
শোকে স্তব্ধ পরিবার ও এলাকা
মুহাম্মদ শাহজাহান ও তাঁর ছেলে মুহাম্মদ আরিফ ছিলেন ফটিকছড়ির পাইন্দং ইউনিয়নের বাসিন্দা। একসঙ্গে বাবা ও ছেলের মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের কালো ছায়া।
যে ঘরে সকালবেলা দু’জন মানুষ জীবিত বেরিয়েছিলেন, সেই ঘরেই ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। প্রতিবেশীদের চোখেও দেখা গেছে কান্না।
স্থানীয়দের ভাষায়, “একটি পরিবার একদিনেই যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।”
চালক আটক, আইনি প্রক্রিয়া শুরু
ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হোসেন জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর বাসটির চালককে আটক করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রশ্ন রেখে গেল আরেকটি মৃত্যু
ফটিকছড়ির আমতলের এই রক্তাক্ত সকাল আবারও মনে করিয়ে দিল, সড়কে এক মুহূর্তের বেপরোয়া গতি কত সহজেই কেড়ে নিতে পারে একাধিক জীবন।
মুহাম্মদ শাহজাহান ও তাঁর ছেলে মুহাম্মদ আরিফ আর কখনও ফিরবেন না। কিন্তু তাঁদের মৃত্যু নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—সড়কে প্রাণহানি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা আর কতদিন অপেক্ষা করবে?
কারণ একটি দুর্ঘটনায় শুধু দুটি প্রাণই ঝরে যায় না, নিভে যায় একটি পরিবারের আলো, ভেঙে যায় অসংখ্য স্বপ্ন, আর রেখে যায় আজীবনের না-পাওয়া ও না-ফেরার বেদনা।

