চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের একের পর এক ঝটিকা মিছিল, হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠা সংগঠনের কর্মীদের তৎপরতা এবং গ্রেপ্তার হওয়া নেতাকর্মীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে নতুন এক প্রশ্ন সামনে এসেছে: নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও কীভাবে সাংগঠনিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে এই নেটওয়ার্ক?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বিষয়টি আর শুধুমাত্র কয়েকটি বিচ্ছিন্ন মিছিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
বরং মিছিল, গ্রেপ্তার, কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের ব্যয় নির্বাহ এবং সাংগঠনিক যোগাযোগ—সবকিছুর পেছনে একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক কাঠামো কাজ করছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের প্রধান বিষয়।
সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর জিইসি মোড় ও অক্সিজেন এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বড় দুটি ঝটিকা মিছিল নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। মিছিলের পরপরই ব্যাপক অভিযান চালিয়ে ৬৮ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গ্রেপ্তারের পর তদন্তকারীদের হাতে আসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরকে ঘুরিয়ে দেয় সম্ভাব্য অর্থদাতাদের দিকে।
সিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) আমিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের পিসি কার্ডে অর্থ জমা, মিছিলের নেপথ্য সমন্বয় এবং সম্ভাব্য অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ডজনখানেক ব্যবসায়ীকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের বিষয়ে তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নিষিদ্ধ সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই জেনে যান যে কারাগারে গেলে তাদের পরিবার কিংবা মামলার ব্যয় নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
কারণ নির্দিষ্ট একটি চ্যানেলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা পৌঁছে যাবে। এই তথ্যই তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গোয়েন্দা নজরদারিতে উঠে এসেছে কারাগারে বন্দি নেতাকর্মীদের পিসি কার্ডে নিয়মিত অর্থ জমা হওয়ার বিষয়।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, চিহ্নিত কোনো নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তার পিসি কার্ডে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা হচ্ছে। অর্থ শেষ হওয়ার আগেই আবার নতুন করে টাকা জমা দেওয়া হচ্ছে।
এমনকি উৎসব-পার্বণের আগে একযোগে অনেক বন্দির অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ অর্থ জমা হওয়ার তথ্যও নজরে এসেছে।
এই অর্থের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে তদন্তকারীদের নজরে আসে কয়েকজন আলোচিত ব্যবসায়ীর নাম।
জাতীয় একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নজরদারিতে থাকা ব্যক্তিদের অন্যতম হলেন দেশের বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান কেএসআরএম গ্রুপের ডিএমডি শাহরিয়ার জাহান রাহাত।
একই প্রতিবেদনে সমতা শিপিংয়ের মালিক আজিজুর রহমান, সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান ও ওয়েল গ্রুপের মালিক আব্দুস ছালাম, এশিয়ান গ্রুপের পরিচালক সাকিফ আহমেদ সালাম, বনফুল গ্রুপের এম এ মোতালেব এবং স্মার্ট গ্রুপের মজিবুর রহমানের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।সূত্র-আমারদেশ
তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারও নাম নজরদারিতে থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। বরং তথ্য-উপাত্ত যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত চিত্র উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে শাহরিয়ার জাহান রাহাতের নাম। কারণ শিল্প ও বাণিজ্যিক অঙ্গনে তার অবস্থান এবং অতীতে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন ব্যবসায়িক সুবিধা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারের কারণে কেএসআরএম গ্রুপের সঙ্গে ক্ষমতাসীন মহলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
সেই সূত্র ধরেই বর্তমানে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে—নিষিদ্ধ সংগঠনের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনায় কেন বারবার উঠে আসছে শাহরিয়ার জাহান রাহাতের নাম?
তদন্তকারীদের মতে, বিষয়টি কেবল কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, বরং অর্থের প্রবাহ কোথা থেকে শুরু হয়ে কোথায় গিয়ে শেষ হচ্ছে, সেটি খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কারণ সংগঠনের সাংগঠনিক সক্ষমতা, ঝটিকা মিছিলের ধারাবাহিকতা এবং গ্রেপ্তার-পরবর্তী অর্থনৈতিক নিরাপত্তা—এসব কিছুর পেছনে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ছাড়া দীর্ঘসময় টিকে থাকা কঠিন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের একটি গভীর সম্পর্কের চিত্রও সামনে নিয়ে আসবে।
তাদের মতে, প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ার পরও যদি কোনো সংগঠন মাঠে সক্রিয় থাকতে পারে, তাহলে তার পেছনের আর্থিক ভিত্তি অনুসন্ধান করা অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে তদন্ত এগিয়ে চললেও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
ফলে আইনগতভাবে তারা সবাই নির্দোষ বলেই বিবেচিত হবেন, যতক্ষণ না তদন্ত ও আদালতের মাধ্যমে ভিন্ন কিছু প্রমাণিত হয়।
তবু একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—নিষিদ্ধ সংগঠনের অর্থের সাপ্লাই চেইন কি এখনো অক্ষত? আর যদি অক্ষতই থাকে, তবে সেই নেটওয়ার্কের মূল নিয়ন্ত্রক কারা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন গোয়েন্দা নজরদারির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কেএসআরএম গ্রুপের ডিএমডি শাহরিয়ার জাহান রাহাতসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী।
এ বিষয়ে কেএসআরএম গ্রুপের ডিএমডি শাহরিয়ার জাহান রাহাতের প্রতিক্রিয়া জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি থেকে কোন বক্তব্য পাঠালে তা প্রকাশ করা হবে।
এদিকে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান। তার মতে, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এখনো পূর্ববর্তী রাজনৈতিক শক্তির অনুগত কিছু ব্যক্তি সক্রিয় থাকতে পারে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলাকে জটিল করে তুলছে।
তিনি বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক ঝটিকা তৎপরতা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত জনসাধারণের প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির কারণে তারা বড় ধরনের কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
তবে এসব তৎপরতা যদি সময়মতো নিয়ন্ত্রণে আনা না যায় এবং অর্থায়ন ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের উৎস শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
তার ভাষায়, “যেকোনো নিষিদ্ধ বা চরমপন্থী রাজনৈতিক নেটওয়ার্ককে মূল্যায়ন করতে হলে শুধু মাঠের কর্মসূচি নয়, এর পেছনের অর্থায়ন, সংগঠন ও সমন্বয় কাঠামোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। অন্যথায় সমস্যার মূল উৎস অক্ষত থেকে যাবে।”

