চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের চেনামতি বড়ুয়া পাড়ায় ঘটে যাওয়া মা-মেয়ে হত্যাকাণ্ড পুরো এলাকায় যেন এক গভীর শোক ও স্তব্ধতার আবরণ তৈরি করেছে।
৪০ বছর বয়সী এনি বড়ুয়া এবং তার ১৬ বছর বয়সী কিশোরী মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়ার নিথর দেহ গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক জীবনবোধকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, ঘটনার মূল সন্দেহভাজন রিমন বড়ুয়া প্রকাশ তেজু বড়ুয়া গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পুরোনো ঋণ-সংক্রান্ত স্ট্যাম্প চুরির উদ্দেশ্যেই সে রাতে বাড়ির পেছনে ওঁৎ পেতে ছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা মুহূর্তেই রূপ নেয় ভয়াবহ সহিংসতায়।
স্থানীয় সূত্র ও তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য বলছে, ভিকটিম এনি বড়ুয়া তাকে দেখে ফেললে চিৎকার করেন। সেই চিৎকার যেন পুরো ঘটনাটিকে এক বিভীষিকাময় মোড়ে নিয়ে যায়।
এরপর একের পর এক ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান মা ও মেয়ে। ঘটনাস্থলে পরে থাকা নীরবতা যেন সেই রাতের আতঙ্ককে আরও গভীর করে তোলে।
আরও হৃদয়বিদারক দিক হলো—মায়ের চিৎকার শুনে ১৬ বছরের প্রিয়ন্তী বড়ুয়া এগিয়ে এলে তাকেও নির্মমভাবে আঘাত করা হয়।
মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবার পরিণত হয় শোকের প্রতীকে। পাঁচ বছর বয়সী আরেক শিশু আহত অবস্থায় প্রাণে বেঁচে যায়। তবে হয়তো আজীবন এই রাতের স্মৃতি বয়ে বেড়াবে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ মাসুদ আলম বলেছেন, ঘটনাস্থল ত্যাগের সময় অভিযুক্ত মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায়, যা পরে পটিয়া এলাকার একটি ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয়।
হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটিও উদ্ধার হয়েছে বাড়ির পেছনের খাল এলাকা থেকে। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, এসব আলামত ঘটনাটির প্রমাণ সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে-একটি আর্থিক বিরোধ বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কীভাবে এমন নির্মম দ্বিগুণ হত্যায় রূপ নেয়?
গ্রামবাসীদের অনেকেই বলছেন, ঘটনাটি যতটা না পরিকল্পিত চুরির, তার চেয়ে বেশি এক ভয়াবহ সহিংস মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ মাসুদ আলম বলেছেন, তদন্ত এখনও চলমান। ঘটনার পেছনে আরও কোনো সংশ্লিষ্টতা বা পূর্বপরিকল্পনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এলাকাজুড়ে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।
চেনামতির এই ঘটনা গ্রামীণ সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নিরাপত্তাহীনতা, সম্পর্কের ভাঙন এবং হঠাৎ বিস্ফোরিত সহিংসতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
পুরো এলাকায় এখনো ভারী হয়ে আছে শোক, আতঙ্ক এবং অজস্র প্রশ্ন।

