চুরি, ছিনতাই কিংবা ডাকাতির ঘটনায় হারিয়ে যাওয়া একটি মোবাইল ফোনের মালিক সাধারণত শেষ আশ্রয় হিসেবে আইএমইআই নম্বরের ওপর ভরসা করেন।
সেই নম্বরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফোনটির অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করে। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরীতে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র সেই পরিচয়ই মুছে দিচ্ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ বলছে, চোরাই মোবাইল সংগ্রহ করে বিশেষ সফটওয়্যার ও ডিজিটাল যন্ত্রপাতির মাধ্যমে আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করা হতো।
শুধু নম্বর বদলেই শেষ নয়, ফোনের বাহ্যিক কাঠামোও পরিবর্তন করে সেটিকে নতুন বা ভিন্ন মডেলের মতো দেখিয়ে বাজারজাত করা হতো।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই কারবারের সূত্র ধরে অবশেষে পাঁচ সদস্যের একটি চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালী থানা পুলিশ।
পুলিশ জানায়, সিএমপির পুলিশ কমিশনারের নির্দেশনায় কোতোয়ালী থানার একটি বিশেষ আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার অভিযান চালায়।
প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয় জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে জাহাঙ্গীর মনিকে। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নন্দনকানন আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের মূলহোতা মুহাম্মদ সোহেল উদ্দিন ওরফে পার্টি সোহেলসহ আরও চারজনকে আটক করা হয়।
গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন—আবু সাঈদ, মো. শামীম ও সাইফুল ইসলাম।
অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ২৪টি আইফোনসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোট ১৫৭টি মোবাইল ফোন।
পাশাপাশি পাওয়া গেছে পাঁচটি ল্যাপটপ, ২০১টি সিম কার্ড, একটি মাইক্রোস্কোপ, মোবাইল ফোনের আইএমইআই পরিবর্তনের মেশিন, ৪৪৫টি মোবাইল কেসিং, বিভিন্ন চার্জার, মাল্টিপ্লাগ এবং নগদ এক লাখ এক হাজার ৫০০ টাকা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উদ্ধার হওয়া সরঞ্জামের পরিমাণ দেখে ধারণা করা হচ্ছে সংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন চোর ও ছিনতাইকারী চক্রের কাছ থেকে কম দামে মোবাইল ফোন সংগ্রহ করা হতো।
এরপর বিশেষ সফটওয়্যার ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে ফোনগুলোর আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করা হতো।
একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে বাহ্যিক অংশ পরিবর্তন করে ফোনগুলোকে নতুন রূপ দেওয়া হতো।
এরপর এসব ফোন চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হতো। ফলে কোনো ব্যক্তি তাঁর হারানো ফোনের খোঁজ করতে গেলেও প্রযুক্তিগতভাবে সেটির প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল ফোন এখন যোগাযোগের মাধ্যম ছাড়াও ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংকিং সেবা, আর্থিক লেনদেন ও গুরুত্বপূর্ণ নথিও সংরক্ষিত থাকে।
ফলে চোরাই মোবাইলের আইএমইআই পরিবর্তনের মতো কর্মকাণ্ড শুধু সম্পদ চুরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সংঘবদ্ধ অপরাধীরা নিজেদের কার্যক্রম আরও আড়াল করার চেষ্টা করছে।
তাই এ ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় দণ্ডবিধির ৪১৩/৩৪ ধারাসহ সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার পার্টি সোহেলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় চুরি ও ছিনতাইয়ের আটটি মামলা রয়েছে। জাহাঙ্গীর মনির বিরুদ্ধে রয়েছে চারটি মামলা। এ ছাড়া আবু সাঈদের বিরুদ্ধে গাজীপুরের বাসন থানায় একটি হত্যা মামলা রয়েছে।
এই অভিযানে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্তকারীদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—চোরাই মোবাইল সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত, এবং পরিবর্তিত আইএমইআইযুক্ত কত ফোন ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে?
পুলিশ বলছে, উদ্ধার হওয়া আলামত ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের তথ্যের ভিত্তিতে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক এই অভিযান প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের একটি অন্ধকার দিক সামনে নিয়ে এলেও একই সঙ্গে দেখিয়ে দিয়েছে, অপরাধীরা যতই পরিচয় বদলানোর চেষ্টা করুক, শেষ পর্যন্ত তাদের খুঁজে বের করার পথও তৈরি হচ্ছে।

