back to top

ফেরার কথা ছিল ট্রলার নিয়ে, ফিরলেন কফিনে: সন্দ্বীপে আজ শুধুই কান্নার রোল

প্রকাশিত: ০৫ জুলাই, ২০২৬ ১৩:২৯

নদী আর সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করা সন্দ্বীপের মানুষের কাছে ট্রলার কিংবা জাহাজে ফেরাটা খুবই চেনা দৃশ্য।

প্রকৌশলী আশিকুজ্জামান তামিমেরও বাড়ি ফেরার কথা ছিল চিরচেনা সেই ট্রলারে চড়ে, হাসিমুখে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে তিনি ফিরলেন; তবে ট্রলারে নয়, কাঠের এক নিথর কফিনে।

কর্ণফুলী নদীতে মাছ ধরার ট্রলারে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত নিয়ে ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন এই তরুণ প্রকৌশলী।

শনিবার দিবাগত রাতে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তামিম।

রোববার বিকেলে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায় নিজ গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।

তামিমের এই আকস্মিক বিদায়ে সন্দ্বীপের আকাশে-বাতাসে এখন শুধুই স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নার রোল। তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এই ট্র্যাজেডিতে মোট প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল তিনজনে।

এর আগে গত ৩০ জুনের সেই অভিশপ্ত দুপুর। ঘড়িতে তখন পৌনে ১টা। চট্টগ্রাম নগরের সদরঘাট এলাকায় নোঙর করে রাখা মাছ ধরার ট্রলার ‘এফভি দেশ’-এর ভেতর কর্মব্যস্ত ছিলেন নাবিক ও প্রকৌশলীরা।

জাহাজের ক্যাপ্টেন জুবায়ের মাহমুদ সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, দুপুর পৌনে ১টার দিকে ট্রলারের ইঞ্জিন কক্ষে হঠাৎ বিকট শব্দে একটি বিস্ফোরণ ঘটে।

বিস্ফোরণের মুহূর্তেই পুরো ইঞ্জিন কক্ষে দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে চেনা কর্মস্থলটি পরিণত হয় এক জীবন্ত নরকে।

কালো ধোঁয়ায় দম আটকে আসা আর আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যে বাঁচার আকুতি জানাতে থাকেন ভেতরে থাকা মানুষগুলো।

গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তামিমসহ বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এক এক করে নিভে গেল তিনটি প্রাণ

এই অগ্নিকাণ্ড কেবল তিনটি জীবন কেড়ে নেয়নি, চুরমার করে দিয়েছে তিনটি পরিবারের স্বপ্ন। ঘটনার দিন অর্থাৎ ৩০ জুন সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়ার পথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ট্রলারের ইঞ্জিন বিভাগের গ্রিজার মো. রুবেল (৩২) ও শাহ আলম (৪০)।

সহকর্মীদের হারানোর ধাক্কা আর শরীরের তীব্র পোড়া ক্ষত নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় লড়ছিলেন প্রকৌশলী তামিম।

স্বজনদের আশা ছিল, তামিম হয়তো অলৌকিকভাবে ফিরে আসবেন তাদের মাঝে। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে শনিবার রাতে লাইফ সাপোর্ট খুলে ঘোষণা করা হয় তামিমের মৃত্যুর সংবাদ।

ক্ষত আর ট্রমা নিয়ে বেঁচে আছেন যারা

সেদিনের আগুনের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, ‘এফভি দেশ’-এর পাশে নোঙর করে রাখা ‘এফভি ডিজনি’ নামের আরেকটি ট্রলারও আগুনের কবলে পড়ে। সে সময় দগ্ধ হন ওই ট্রলারের নাবিক নিজাম উদ্দিন, মো. রাসেল ও ছিদ্দিক আহমেদ।

তারা চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর সুস্থ হয়ে সম্প্রতি ছাড়পত্র পেয়েছেন।

শরীরিক ক্ষত হয়তো তাদের উপশম হয়েছে, কিন্তু চোখের সামনে সহকর্মীদের পুড়ে যাওয়ার এবং মারা যাওয়ার সেই বীভৎস স্মৃতি তাদের তাড়া করে বেড়াবে আজীবন।

নদী যাদের জীবিকার উৎস, সেই নদীপাড়েই এমন আকস্মিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না নিহতের পরিবার ও সহকর্মীরা।

একটি বিস্ফোরণ আর তাতেই চিরতরে থমকে গেল তিনটি তাজা প্রাণ—এই নির্মমতার শেষ কোথায়, এখন সেই প্রশ্নই তুলছেন বন্দরনগরীর মানুষ।