শওকত আলী যেভাবে ফস্কে গেলেন বিএফআইইউর জাল থেকে!

এনবিআরের ৩০৭ কোটির জরিমানা যখন পাচারকারীর কাছে ‘নস্যি’!

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬ ১৩:৩৬

টাকাটা ছিল বাংলাদেশের। উড়াল দিয়েছিল যুক্তরাজ্যে। যখন ব্রিটিশ গোয়েন্দারা সেই টাকার হদিস পেয়ে ঢাকাকে তা ফিরিয়ে নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ দিল, ঠিক তখনই ডেস্কে ডেস্কে ফাইল চালাচালি আর ই-মেইলের চোরাবালিতে হারিয়ে গেল চার সপ্তাহের মহামূল্যবান সময়।

ফলাফল? ২৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০৭ কোটি টাকার সেই বিশাল তহবিল লন্ডন থেকে চোখের পলকে ডানা মেলল সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই)।

আর দেশের আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকেরা এখন বসে বসে গুনছেন ব্যর্থতার খতিয়ান ও কাগজের জরিমানা।

বলছি দেশের আলোচিত ও অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর কথা।

যাকে কেন্দ্র করে দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভেতরে-বাইরে এখন চলছে তীব্র আলোড়ন।

ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) একটি ‘ব্রেকিং নিউজ’ জানায়, শওকত আলী চৌধুরীর ২৫ মিলিয়ন ডলার তারা চার সপ্তাহের জন্য ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করেছে।

শর্ত ছিল একটাই, দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে এবং গোপনীয়তার স্বার্থে এই তথ্য দেশের অন্য কোনো সংস্থা বা আদালতকে জানানো যাবে না।

কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা যেকোনো থ্রিলার সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) বাংলাদেশের কাছে প্রমাণ চাইল-এই অর্থ যে কেবল বাংলাদেশের আইনেই অপরাধ নয়, যুক্তরাজ্যের আইনেও অবৈধ। শুরু হলো ঢাকা-লন্ডন ই-মেইল চালাচালি।

এক বা দুইবার নয়, টানা আট দফা চিঠি বিনিময় হলো। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে আটকে পার হয়ে গেল চার সপ্তাহের সেই ‘ডেডলাইন’।

আইনি সময়সীমা শেষ হওয়া মাত্রই চতুর ব্যবসায়ী শওকত আলী চৌধুরী কালক্ষেপণ না করে পুরো অর্থ যুক্তরাজ্য থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন দুবাইয়ে।

বিএফআইইউর এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আক্ষেপ করে গণমাধ্যমকে জানান, এখন তারা আরব আমিরাত থেকে অর্থ উদ্ধারের নতুন চেষ্টা চালাচ্ছেন।

কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, ঘরের দুয়ারে আসা সম্পদ যারা ধরে রাখতে পারল না, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের মরুভূমি থেকে তারা কীভাবে তা ফিরিয়ে আনবে?

আয়কর আইন, ধারা ২১: “কোনো বাংলাদেশি করদাতার আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত কোনো বিদেশি সম্পদের সন্ধান মিললে এবং তিনি তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে, ওই সম্পদের ন্যায্য বাজারমূল্যের সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা করার বিধান রয়েছে।”

যুক্তরাজ্য থেকে টাকা ফেরানোর সরকারি প্রচেষ্টা যখন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো, তখন নড়েচড়ে বসল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)। চলতি বছরের ১৫ মার্চ তারা নতুন আয়কর আইনের ২১ ধারা মোতাবেক শওকত আলী চৌধুরীর ওপর চাবুক চালাল।

ওই দিনের ডলারের বিনিময় হার অনুযায়ী, শওকতের অপ্রদর্শিত বিদেশি সম্পদের সমমূল্য-অর্থাৎ ৩০৬ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এর মাধ্যমে একটি আইনি পথ তৈরি হয়েছে বটে, বিদেশে থাকা সম্পদ দেশে ফেরত আনা না গেলেও দেশেই তার সমপরিমাণ অর্থ আদায়ের সুযোগ পাবে রাষ্ট্র।

কিন্তু শওকত আলী চৌধুরী এখানেও দেখিয়েছেন তার ব্যবসায়িক চালবাজি। মে মাসে তিনি এই অপ্রদর্শিত অর্থের বিপরীতে ১৩৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করলেও, জরিমানার বিশাল অঙ্কের টাকা এখনো পরিশোধ করেননি।

আইন অনুযায়ী, জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করলে আয়কর কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা রয়েছে করদাতার দেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি বা বাজেয়াপ্ত করার।

এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব জোর গলায় বলেছেন, “অর্থ উদ্ধারে সরকার সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।”

কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন-একজন ব্যাংকের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এই আইন কি আদেও প্রয়োগ হবে? নাকি এটি কেবলই জনরোষ কমানোর আইনি সান্ত্বনা?

একটি দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান যখন খোদ অর্থপাচার এবং কর ফাঁকির মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তখন পুরো ব্যাংকিং খাতের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক শওকত আলীকে লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়েছিল-তিনি এই জরিমানার বিরুদ্ধে আপিল করবেন কি না, কিংবা এই ২৫ মিলিয়ন ডলার দেশে ফেরাতে আদৌ রাজি কি না। কিন্তু বরাবরের মতোই তিনি রহস্যময় নীরবতা বজায় রেখেছেন। কোনো জবাব দেননি।

বিএফআইইউর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান এবং তদন্ত শেষে অর্থপাচার আইনে মামলা করা হবে।

কিন্তু যে গাফিলতির কারণে চোখের সামনে দিয়ে ৩০৭ কোটি টাকা উড়ে দুবাই চলে গেল, সেই গাফিলতির দায় কে নেবে?

বিএফআইইউর ভেতরের কোনো পক্ষ কি এই ব্যবসায়ীকে পরোক্ষ সুবিধা পাইয়ে দিতেই সময়ক্ষেপণ করেছিল?

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শওকত আলী চৌধুরীর এই ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির অপরাধ নয়, এটি দেশের গোটা আর্থিক শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

এখন দেখার বিষয়, এনবিআর সত্যি সত্যিই এই শীর্ষ ব্যবসায়ীর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে জরিমানার টাকা আদায় করতে পারে কি না, নাকি আরও একবার অদৃশ্য ইশারায় পার পেয়ে যাবেন এই ব্যাংকিং টাইকুন।

সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সরকারের উচ্চ মহলের কঠোর হস্তক্ষেপই এখন এই লুটেরা সংস্কৃতির লাগাম টানতে পারে।