চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) ২৩ নম্বর বেড—সংখ্যাটি হয়তো কেবল একটি বেড নম্বর। কিন্তু একটি পরিবারের জন্য সেটিই হয়ে উঠেছে শেষ স্মৃতি, শেষ অপেক্ষা, শেষ ভাঙনের ঠিকানা।
সেই বেডেই নিথর হয়ে পড়ে ছিল ১১ বছরের রেশমি আক্তার। চোখ বন্ধ, শরীর নিশ্চল, চারপাশে যন্ত্রের শব্দ—কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
চিকিৎসকেরা বলছিলেন, সে ‘ব্রেন ডেড’। অর্থাৎ শরীর আছে, কিন্তু মস্তিষ্ক আর কাজ করছে না। তবুও পরিবার অপেক্ষা করছিল—হয়তো অলৌকিক কিছু ঘটবে, হয়তো একবার চোখ খুলবে তাদের ছোট্ট মেয়েটি।
কিন্তু সেই অপেক্ষা আর শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল পৌনে ১০টায় থেমে যায় রেশমির নিঃশব্দ লড়াই। চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
গত শুক্রবার থেকেই সে আইসিইউতে ভর্তি ছিল—প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মৃত্যুর সঙ্গে এক অসম যুদ্ধ।
রেশমির গল্প শুরু হয় একেবারে সাধারণভাবে—একটি ছোট্ট অনুরোধে। গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাতে তার মা তাকে পাশের দোকানে কিছু কিনতে পাঠিয়েছিলেন।
রৌফাবাদ কলোনির সেই সরু গলিতে হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ শুরু হয় গোলাগুলি। আতঙ্কে ছুটতে থাকে মানুষ, চারপাশ ভরে ওঠে চিৎকারে।
সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেই পড়ে যায় রেশমি।
একটি গুলি এসে লাগে তার চোখের নিচে। গুলিটি ভেতরে ঢুকে মাথার মধ্যে আটকে যায়। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে—একটি নিরীহ শৈশব, রক্তে ভিজে যায় অচেনা এক সহিংসতার মধ্যে।
স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রথমে ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা শুরু হয়।
কিন্তু দ্রুতই বোঝা যায়, তার অবস্থা সংকটাপন্ন। চিকিৎসকেরা আইসিইউ সাপোর্টের কথা বলেন। কিন্তু তখন কোনো আইসিইউ বেড খালি ছিল না।
সময় যেন নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে।
গভীর রাতে পরিবার তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে চমেকে আইসিইউ বেড খালি হলে আবার ফিরিয়ে আনা হয়।
সেই ২৩ নম্বর বেডেই শুরু হয় রেশমির শেষ লড়াই—একটি লড়াই, যেখানে কোনো শব্দ ছিল না, ছিল শুধু নিঃশব্দ বিদায়।
চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে আনার পর থেকেই তার মস্তিষ্ক কাজ করছিল না। সে আর ফিরে আসার অবস্থায় ছিল না।
তবুও বাবা-মা, স্বজনেরা আশা ছাড়েননি। আইসিইউর বাইরে দাঁড়িয়ে প্রতিটি সেকেন্ড গুনেছেন তারা—হয়তো কোনো অলৌকিক খবর শুনবেন বলে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসেছে শুধু একটি বাক্য—“সে আর নেই।”
একই ঘটনায় নিহত হন হাসান ওরফে রাজু (৩২) নামের এক যুবক। তিনি রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা।
সম্প্রতি নাছির নামে এক ব্যক্তি নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি ছিলেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বায়েজিদ এলাকায় বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
সেই সংঘর্ষের গুলিতেই শেষ হয় দুটি জীবন—একটি জড়িয়ে ছিল অপরাধের ছায়ায়, আরেকটি ছিল সম্পূর্ণ নিষ্পাপ।
রেশমির বাবা রিয়াজ আহমেদ, স্থানীয়দের কাছে গুড্ডু নামে পরিচিত, একজন প্রতিবন্ধী সবজি বিক্রেতা। পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট ছিল রেশমি।
দারিদ্র্যের মধ্যেও সে ছিল পরিবারের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো—স্বপ্ন ছিল, হাসি ছিল, ছিল এক সরল শৈশব।
ব্যারিস্টার মিল্কি মেমোরিয়াল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির এই ছাত্রী হয়তো জানত না জীবনের নিষ্ঠুরতা কী। তার পৃথিবী ছিল ছোট—স্কুলের খাতা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা, আর পরিবারের স্নেহ।
আজ সেই পৃথিবী নেই।
আইসিইউর ২৩ নম্বর বেড এখন খালি। কিন্তু সেখানে যেন এখনো ভেসে বেড়ায় এক শিশুর অসমাপ্ত গল্প, এক নিঃশব্দ আর্তনাদ।
রেশমি আর ফিরবে না। তবুও তার গল্প থেকে যায়—একটি প্রশ্ন হয়ে, একটি ব্যথা হয়ে—আমরা কি সত্যিই নিরাপদ আমাদের নিজেদের গলিতেও?

