ওমান থেকে চার কফিন, রাঙ্গুনিয়ায় শোকের মাতম

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২০ মে, ২০২৬ ১৪:৪৫

রাঙ্গুনিয়ার লালানগরে বুধবার ভোরটা ছিল অন্যরকম। গ্রামের সরু পথজুড়ে তখন নিস্তব্ধতা, বাতাসেও যেন ভারী শোকের গন্ধ। একটু পরপর ভেসে আসছিল স্বজনদের বুকফাটা কান্না।

যে বাড়ি থেকে চার ভাই জীবিকার সন্ধানে পাড়ি দিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে, সেই বাড়িতেই এবার ফিরলেন তাঁরা—তবে জীবিত নয়, কফিনবন্দী মরদেহ হয়ে।

গতকাল মঙ্গলবার রাত নয়টার দিকে চার ভাইয়ের মরদেহ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়।

সেখানে উপস্থিত থেকে মরদেহ গ্রহণ করেন চট্টগ্রাম-৭ আসনের (রাঙ্গুনিয়া) সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী। এরপর গভীর রাতে অ্যাম্বুলেন্সে করে কফিনবন্দী মরদেহগুলো নিয়ে যাওয়া হয় রাঙ্গুনিয়ার লালানগরের বাড়িতে।

ভোর হতেই পুরো এলাকা যেন কান্নার জনপদে পরিণত হয়। চারটি কফিন একসঙ্গে বাড়ির উঠানে নামানোর দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা-বাবা, স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

কেউ ছুটে গিয়ে কফিন জড়িয়ে ধরছেন, কেউ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে ভিড় জমায় শুধু একনজর দেখতে—একসঙ্গে চার ভাইয়ের এমন মর্মান্তিক পরিণতি যেন কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।

নিহত চার ভাই হলেন শাহিদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও রাশেদুল ইসলাম।

পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁদের মধ্যে দুজনের আগামী ১৫ মে দেশে ফেরার কথা ছিল। বাড়িতে ফেরার প্রস্তুতিও চলছিল।

পরিবারের জন্য উপহার কিনতে চার ভাই একসঙ্গে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিলেন। কিন্তু সেই পথই হয়ে ওঠে মৃত্যুর পথ।

গত বুধবার রাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি পার্ক করে রাখা গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁদের মরদেহ।

রয়্যাল ওমান পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এগজোস্ট থেকে নির্গত বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে।

এই মৃত্যুর আগে ছিল এক হৃদয়বিদারক আর্তনাদ। চট্টগ্রাম সমিতি, ওমানের সভাপতি মো. ইয়াসিন চৌধুরী জানান, ওই দিন সন্ধ্যায় চার ভাই বারকা এলাকায় ছিলেন।

পরে মুলাদ্দাহর দিকে যাওয়ার পথে রাত আটটার পর তাঁদের একজন এক স্বজনকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে বলেন, “আমরা খুব অসুস্থ… গাড়ি থেকে বের হতে পারছি না।” সঙ্গে পাঠানো হয় লোকেশনও। কিন্তু সেই সাহায্যের আর্তি শেষ পর্যন্ত তাঁদের বাঁচাতে পারেনি।

রাতে মুলাদ্দাহ এলাকায় গাড়িটির ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে দুই বাংলাদেশি প্রবাসী পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে দরজা খুলে চার ভাইয়ের নিথর দেহ উদ্ধার করে।

নিহতদের খালাতো ভাই এমরান হোসেন বলেন, “চার ভাইয়ের জন্য পাশাপাশি কবর খোঁড়া হয়েছে। এমন দৃশ্য জীবনে কখনও দেখব ভাবিনি।” বুধবার বেলা ১১টার দিকে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে তাঁদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজার সময় পুরো এলাকা কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে। অনেককেই চোখ মুছতে দেখা যায়, কেউ আবার নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন চার ভাইয়ের পাশাপাশি রাখা কফিনগুলোর দিকে তাকিয়ে।

সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী বলেন, “একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুতে পুরো রাঙ্গুনিয়া শোকাহত। সরকারের পক্ষ থেকে দাফন ও পরিবহন খরচের জন্য পরিবারটিকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।”

প্রবাসের কঠিন জীবন পেরিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন চার ভাই। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।

জীবিকার সন্ধানে যাওয়া চার সন্তান এবার ফিরলেন কাঠের কফিনে শুয়ে। রাঙ্গুনিয়ার আকাশে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এক মায়ের বুক কীভাবে একসঙ্গে চার সন্তানের শূন্যতা সহ্য করবে?