চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে দাঁড়িয়ে আছে ‘এমটি ফসিল’। ফুজাইরা থেকে আনা এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল যেন শুধু একটি জাহাজ নয়, এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপা থাকা যুদ্ধ-ঝুঁকির ভেতর দিয়ে টিকে থাকার সাময়িক স্বস্তির নাম।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও।
সেই অস্থিরতার মধ্যেই শুক্রবার (২২ মে) ভোররাতে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে নোঙর ফেলে পানামার পতাকাবাহী ২৪৮ দশমিক ৯৬ মিটার দীর্ঘ জাহাজ ‘এমটি ফসিল’। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে বিপিসির জন্য এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারিতে এই ক্রুড অয়েল পরিশোধনের মাধ্যমে পাওয়া যাবে এলপিজি, পেট্রল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলসহ মোট ১৬ ধরনের জ্বালানি পণ্য।
এর আগে যুদ্ধের কারণে ক্রুড অয়েলের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে গেলে গত ১২ এপ্রিল রাতে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় ইস্টার্ন রিফাইনারির ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত রিফাইনারির এই স্থবিরতা জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে।
তবে সংকট দীর্ঘায়িত হয়নি। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে ধারাবাহিকভাবে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত ডিজেল, অকটেনসহ বিভিন্ন জ্বালানি আসতে থাকে।
একের পর এক জাহাজ ভিড়ে দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং জ্বালানি সংকট কেটে যায়।
সূত্র বলছে, বিপিসির জন্য সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে লোড করা প্রায় এক লাখ টন ক্রুড ‘নর্ডিকস পলাক্স’ জাহাজে আটকে আছে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই চালান এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে।
এই অবস্থায় বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দর থেকে সরবরাহ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিপিসি।
সেই পথেই এক লাখ টনের বেশি ক্রুড নিয়ে ‘এমটি নিনেমিয়া’ ২১ এপ্রিল যাত্রা শুরু করে এবং ৬ মে চট্টগ্রামে পৌঁছে সফলভাবে লাইটারিং সম্পন্ন করে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তেল সরবরাহ করে। এরপরই রিফাইনারির কার্যক্রম আবার চালু হয়।
এবারের ‘এমটি ফসিল’ জাহাজটি সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। জাহাজটি বহির্নোঙরে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
তিনি জানান, কাস্টমস ও সার্ভেয়ার কোম্পানির আনুষ্ঠানিকতা শেষে লাইটারিং প্রক্রিয়া শুরু হবে। নগরের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ছোট ট্যাংকার জাহাজে করে তেল স্থানান্তর করা হবে।
প্রয়োজনীয় সংখ্যক লাইটার জাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জানা গেছে, ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে, যা দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ। বাকি ৮০ শতাংশের বড় অংশই আমদানি নির্ভর।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদার মধ্যে ৯২ শতাংশই আসে আমদানি থেকে। ডিজেলই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জ্বালানি, এরপর রয়েছে ফার্নেস অয়েল, পেট্রল, অকটেন, কেরোসিন ও জেট ফুয়েল।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ টন জ্বালানি বিক্রি করেছে—যা দেশের জ্বালানি নির্ভরতার বাস্তব চিত্রই আরও স্পষ্ট করে।
একদিকে যুদ্ধ, অন্যদিকে সমুদ্রপথের অনিশ্চয়তা। এই দুই চাপের মাঝেই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন দাঁড়িয়ে আছে বিকল্প রুট, বিকল্প বন্দর আর ধারাবাহিক জাহাজ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। ‘এমটি ফসিল’ সেই বাস্তবতারই নতুন একটি অধ্যায়, স্বস্তির সাময়িক বার্তাও।

