back to top

ফটিকছড়িতে নবনির্মিত বারমাসিয়া রক্ষা কালী মন্দিরের মহাসিন্ধুর দ্বার উন্মোচন ১৭ই জুন: ভক্তিরসে আপ্লুত সনাতন সমাজ

প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০২৬ ২০:২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক |

ওঁ কালী কালী মহাকালী কালীকে পাপহারিণী।

ধর্মার্থমোক্ষদে দেবী নারায়ণী নমোস্তুতে।।”

 

মহাকালের অবিনশ্বর ধ্বনি আর তিমিরবিনাশী শক্তির আবাহনে মুখরিত হতে যাচ্ছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির পুণ্যভূমি। স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন, অবিচল আস্থা আর যৌথ ত্যাগের মহিমান্বিত ফসল হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে দৃষ্টিনন্দন ‘বারমাসিয়া সর্বজনীন শ্রীশ্রী রক্ষা কালী মন্দির’। আগামী ২রা আষাঢ়, বুধবার (১৭ই জুন) এক অলৌকিক ও ভাবগম্ভীর পরিবেশের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই নবমন্দিরের মহাসিন্ধুর দ্বার উন্মোচন ও গৃহপ্রবেশ উৎসব।

মা কালীর চরণে আত্মনিবেদনের এই পরম মাহেন্দ্রক্ষণকে কেন্দ্র করে সমগ্র এলাকায় এক স্বর্গীয় ও উৎসবমুখর আবহের সৃষ্টি হয়েছে।

আধ্যাত্মিক সুধায় জড়ানো দিনব্যাপী মাঙ্গলিক আয়োজন

মন্দির পরিচালনা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এই মহতী দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং ব্রহ্মাণ্ডের সকল জীবের কল্যাণে দিনব্যাপী বিস্তারিত ধর্মীয় আচার ও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের সময়সূচি ও আধ্যাত্মিক পর্বসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:

সময়ধর্মীয় অনুষ্ঠান মাঙ্গলিক পর্ব
সকাল ০৮:০০টাবৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে মন্দিরে প্রবেশের মূল পূজার শুভ সূচনা।
সকাল ০৯:৩০টাবিশ্বশান্তি কামনায় ভক্তদের সমবেত কণ্ঠে শ্রীমদ্ভগবদগীতা ও শ্রীশ্রী চণ্ডীপাঠ।
বেলা ১১:০০টাহরিনাম সংকীর্তন ও মায়ের মহিমাসূচক ভক্তিগীতি পরিবেশন।
দুপুর ১২:৩০টাদেশ ও জাতির কল্যাণার্থে মঙ্গলারতি ও সহস্র প্রদীপ প্রজ্বলন।
দুপুর ০১:৩০টাভক্তবৃন্দের মাঝে অমৃতসম মহাপ্রসাদ বিতরণ।

মায়ের চরণে ভক্তি অর্ঘ্য: সনাতন শাস্ত্রের অনন্য কালী মন্ত্রসমূহ

সনাতন ধর্মে মা কালী কেবল বিনাশের দেবী নন, তিনি পরম করুণাময়ী, ভক্তের দুঃখহারিণী এবং মোক্ষদাত্রী জননী। এই মহাসন্ধিক্ষণে ভক্তদের আধ্যাত্মিক চেতনাকে জাগ্রত করতে এবং গৃহকোণকে মায়ের আশীর্বাদে ধন্য করতে নিচে শাস্ত্রীয় কিছু পরম পবিত্র কালী মন্ত্র অর্থসহ সংকলিত করা হলো, যা এই উৎসবের মূল সুরকে আরও গভীর করে তোলে:

# ধ্যানের মূল মন্ত্র (নমস্কার মন্ত্র)#

ওঁ জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।

দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোঽস্তু তে।।”

  • ভাবার্থ: হে জয়দায়িনী, সর্বমঙ্গলকারিণী, নিয়ন্ত্রী, কল্যাণময়ী, মুণ্ডমালাধারিণী, দুর্ভেদ্য দুঃখনাশিনী, পরমেশ্বরী, ক্ষমাশীলা, জগতের ধাত্রী—তোমাকে আমার অন্তরের ভক্তিপূর্ণ প্রণাম।

# ভয় দুঃখ বিনাশের বীজ মন্ত্র#

ওঁ ক্রীং কালিকায়ৈ নমঃ।।”

  • ভাবার্থ: এই একাক্ষরী বীজ মন্ত্রটি মায়ের আদি ও অনন্ত শক্তির প্রতীক। এটি জপের মাধ্যমে মানুষের অন্তরের অন্ধকার, ভয় এবং নেতিবাচক শক্তি দূর হয়ে পরম শান্তি বিরাজ করে।

#রোগ, শোক পাপ মুক্তির প্রার্থনা মন্ত্র#

ওঁ কালী কালী মহাকালী কালীকে পাপহারিণী।

ধর্মার্থমোক্ষদে দেবী নারায়ণী নমোস্তুতে।।”

  • ভাবার্থ: হে মহাকালী, তুমি পরমেশ্বরী এবং মানবজীবনের সকল পাপের বিনাশকারিনী। তুমি আমাদের ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ দান করো। হে নারায়ণী, তোমাকে জানাই কোটি প্রণাম।

#মায়ের গায়ত্রী মন্ত্র (আত্মশুদ্ধির মন্ত্র)#

ওঁ কালিকায়ৈ বিদ্মহে শ্মশানবাসিন্যৈ ধীমহি।

তন্নো ঘোরে প্রচোদয়াৎ।।”

  • ভাবার্থ: আমরা সেই পরমেশ্বরী কালিকার স্বরূপকে অনুধাবন করি, যিনি শ্মশানবাসিনী (মোহের অন্তকারী) রূপে বিরাজমান। সেই মহাকালী আমাদের বুদ্ধি ও চেতনাকে সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত করুন।

*সর্বস্তরের ভক্তদের প্রতি আকুল আহ্বান

সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভক্তদের অকৃপণ আর্থিক অনুদান এবং ঐকান্তিক শ্রমে নির্মিত এই দেবালয়টি আজ ফটিকছড়ির সনাতন সংস্কৃতির এক অনন্য বাতিঘর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।

মন্দির পরিচালনা পরিষদের কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন:

“এই নবমন্দির প্রতিষ্ঠা কেবল পাথরের কোনো স্থাপনা নয়, এটি আমাদের ভক্তি, বিশ্বাস এবং সনাতনী ঐক্যের পরম প্রতীক। মায়ের এই মহতী উৎসবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভক্তপ্রাণ শুভানুধ্যায়ী ও সর্বস্তরের মানুষকে উপস্থিত থেকে পুণ্যময় আতিথ্য গ্রহণ ও অনুষ্ঠানটি সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য আমরা বিনীত ও সশ্রদ্ধ আহ্বান জানাচ্ছি। মায়ের কৃপায় সকলের জীবন আলোকময় হয়ে উঠুক।”

আসুন, আগামী ১৭ই জুন শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর কর্পূরের সুবাসে ঘেরা এই পুণ্যলগ্নে আমরা সবাই সমবেত হই ফটিকছড়ির বারমাসিয়া সর্বজনীন রক্ষা কালী মন্দির প্রাঙ্গণে—যেখানে ভক্তের ভক্তি আর মায়ের করুণা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে।

জয় মা কালী, জয় মা রক্ষা কালী।”