back to top

সিঁড়ির পাশে কালো প্যাকেট, খুলতেই মিলল হৃদয়বিদারক সত্য

প্রকাশিত: ১৭ জুন, ২০২৬ ০৮:২০

মিরসরাইয়ের উত্তর সোনাপাহাড় এলাকার একটি নির্জন ঘরের সিঁড়ির পাশে পড়ে ছিল কালো পলিথিনে মোড়ানো একটি প্যাকেট।

বাইরে থেকে দেখে সেটি ছিল আর দশটি পরিত্যক্ত প্যাকেটের মতোই। কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক হৃদয়বিদারক গল্প—একটি সদ্যজাত কন্যাশিশুর বেঁচে থাকার আকুতি।

মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে ভোলা সওদাগর বাড়ির মীর হোসেন প্রথম প্যাকেটটি দেখতে পান। ঘরটি দীর্ঘদিন খালি পড়ে থাকায় তাঁর মনে সন্দেহ জাগে।

কাছে যেতেই কানে আসে ক্ষীণ কান্নার শব্দ। পলিথিন খুলতেই তিনি হতবাক—ভেতরে শুয়ে আছে সদ্য পৃথিবীর আলো দেখা একটি নবজাতক কন্যাশিশু।প্যাকেট

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে খবরটি। বিস্ময়, আতঙ্ক, ক্ষোভ আর মমতা—সব অনুভূতি একসঙ্গে ভর করে স্থানীয় মানুষের মনে।

কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, কী এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে জন্মের পরই একটি শিশুকে এভাবে পরিত্যাগ করতে হলো? আবার কেউ শিশুটির ভাগ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তবে এই ঘটনার সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকটি এসেছে মানুষের মানবিকতা থেকে। প্রতিবেশী আহম্মদ উল্ল্যাহর সহযোগিতায় দ্রুত শিশুটিকে উদ্ধার করে বারইয়ারহাট শেফা ইনসান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সময় নষ্ট হলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্নও হতে পারত।

হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা দেখতে পান, নবজাতকের শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।

তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে ধীরে ধীরে তার অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এস. এ. ফারুক জানান, শিশুটি বর্তমানে আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে।

ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরেও আসে।

মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা শিশু কল্যাণ বোর্ডের সভাপতি সোমাইয়া আক্তার হাসপাতালে গিয়ে শিশুটিকে দেখে আসেন। তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন, শিশুটির অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেন এবং চিকিৎসাসেবায় সন্তোষ প্রকাশ করেন।

উপজেলা শিশু কল্যাণ বোর্ডের সভায় শিশুটির স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও পরবর্তী নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রয়োজন হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হবে। আর সুস্থ থাকলে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তার দত্তক গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

এই নবজাতকের পরিচয় এখনো অজানা। জানা যায়নি তার মা-বাবা কারা, কোথা থেকে এসেছে সে, কিংবা কেন তাকে এমন নির্মম পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিচয়হীন এই শিশুটি ইতোমধ্যেই মানুষের হৃদয়ে একটি পরিচয় তৈরি করেছে—সে বেঁচে থাকার প্রতীক।

যে শিশুটি জন্মের পরই মুখোমুখি হয়েছিল অন্ধকার, অবহেলা আর মৃত্যুঝুঁকির, সেই শিশুটির পাশে আজ দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষ, চিকিৎসক ও প্রশাসন। হয়তো এটাই সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি—সব নিষ্ঠুরতার মাঝেও মানবিকতা এখনো বেঁচে আছে।

কালো পলিথিনের অন্ধকার ভেদ করে নবজাতকটি এখন নতুন জীবনের পথে। তার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা সময়ই বলবে।

তবে আপাতত মিরসরাইয়ের মানুষ একটাই প্রার্থনা করছেন—শিশুটি যেন নিরাপদ আশ্রয়, ভালোবাসা আর সম্মানের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠার সুযোগ পায়।