চট্টগ্রামের পটিয়ার দক্ষিণ গোবিন্দার খীল এলাকার পূর্বপাড়া গ্রামে পাঁচ বছর বয়সী শিশু মো. জায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্ক একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে।
যে শিশুকে খুঁজে পেতে পরিবার ও প্রতিবেশীরা দুই দিন ধরে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেছে, শেষ পর্যন্ত তার বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে বাড়ির পাশের ময়লার ভাগাড় থেকে।
আরও ভয়াবহ হলো, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক করা হয়েছে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে।
নিহত জায়হান স্থানীয় গ্যারেজ ব্যবসায়ী শাহজাহানের একমাত্র সন্তান। গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে বাড়ির সামনের রাস্তায় খেলার সময় সে নিখোঁজ হয়।
প্রথমে পরিবারের ধারণা ছিল, শিশুটি হয়তো পুকুরে পড়ে গেছে। স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে পুকুরে তল্লাশি চালিয়েও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। পরে পটিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। শাহজাহানের শয়নকক্ষের বিছানায় পাওয়া যায় একটি হাতে লেখা চিঠি। সেখানে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। একই সঙ্গে পরিবারের একজন সদস্যের মোবাইল ফোন আনলক অবস্থায় নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই চিঠি নিছক একটি মুক্তিপণের দাবি ছিল, নাকি শুরু থেকেই অপরাধ আড়াল করার কৌশল—এ প্রশ্ন এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত চালানোর একপর্যায়ে সন্দেহের তীর যায় প্রতিবেশী একটি পরিবারের দিকে।
বৃহস্পতিবার ভোরে ওই পরিবারের বসতঘরের পেছন থেকে উদ্ধার করা হয় জায়হানের বস্তাবন্দি মরদেহ। ঘটনায় আটক করা হয়েছে মো. সাইফুল, শাহানুর, নিহা, নিহান ও ওয়াসিফাকে।
স্বজনদের অভিযোগ, টাকার লোভে শিশুটিকে অপহরণ করা হয়েছিল। পরে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়। এরপর মরদেহ বস্তায় ভরে ময়লার ভাগাড়ে ফেলে রাখা হয়।
ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও সামাজিকভাবে উদ্বেগজনক দিকটি হলো, অভিযোগ অনুযায়ী যাদের বিরুদ্ধে সন্দেহ উঠেছে, তারা ঘটনার পর পরিবারের সঙ্গে শিশুটিকে খোঁজার কাজেও অংশ নিয়েছিল।
যদি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি কেবল একটি অপহরণ বা হত্যার ঘটনা নয়; বরং বিশ্বাসের সম্পর্ককে ব্যবহার করে সংঘটিত এক ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
জায়হানের মামা ওয়াজেদ আলী জিসানের কথায় সেই বেদনারই প্রতিফলন পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, যারা পরিবারের সঙ্গে খোঁজাখুঁজি করেছে, একই এলাকায় বসবাস করেছে, তারাই শিশুটিকে হত্যা করেছে—এ কথা মেনে নেওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী জানিয়েছেন, উদ্ধার করা মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
আটক পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানা যাবে।
তবে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে শিশু নিরাপত্তার প্রশ্ন। পরিবারের কাছের মানুষ, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিতজন—শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বহু ঘটনায় অভিযুক্তদের সঙ্গে ভুক্তভোগীর পূর্বপরিচয় থাকার বিষয়টি নতুন নয়।
ফলে শিশু সুরক্ষার আলোচনায় শুধু বাইরের হুমকি নয়, নিকটবর্তী সামাজিক পরিবেশও গুরুত্ব পাচ্ছে।
পটিয়ার ছোট্ট জায়হান আর ফিরবে না। কিন্তু তার মৃত্যু একটি বড় প্রশ্ন রেখে গেল—একটি সমাজে যখন বিশ্বাসের সবচেয়ে কাছের বৃত্তও সন্দেহের কেন্দ্রে চলে আসে, তখন শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে নেবে, আর কীভাবে নেবে?

