back to top

বিশ্বকাপে নতুন অধ্যায় লিখল দক্ষিণ আফ্রিকা-অপেক্ষায় দক্ষিণ কোরিয়া

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬ ০৪:০৯

বিশ্বমঞ্চে ফুটবলের নতুন এক রূপকথার জন্ম দিল দক্ষিণ আফ্রিকা। এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে ‘বাফানা বাফানা’রা।

মেক্সিকোর মন্তেরেই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘এ’ গ্রুপের বাঁচা-মরার ম্যাচে আফ্রিকান প্রতিনিধিদের এই জয় শুধু তিনটি পয়েন্টই এনে দেয়নি, বরং লিখে দিয়েছে দেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়গুলোর একটি।

৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের দ্বিতীয় স্থানে থেকে স্বাগতিক মেক্সিকোর সঙ্গে শেষ বত্রিশের টিকিট নিশ্চিত করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা।

আগামী ২৮ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নকআউট পর্বে সহ-আয়োজক কানাডার মুখোমুখি হবে তারা।

অন্যদিকে, ভাগ্য নিজেদের হাতেই রেখেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। ড্র করলেই নকআউট নিশ্চিত হতো সন হিউং-মিনদের।

কিন্তু গোলমুখে ব্যর্থতা আর প্রতিপক্ষের দৃঢ় প্রতিরোধে শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে এশিয়ান জায়ান্টদের।

তবে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান এখনই শেষ হয়ে যায়নি। তিন ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপে তৃতীয় হওয়া কোরিয়া টুর্নামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী সেরা আটটি ‘সেরা তৃতীয়’ দলের একটি হিসেবে শেষ বত্রিশে জায়গা পাওয়ার ক্ষীণ আশা এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে।

যদিও সেই সম্ভাবনা এখন নির্ভর করছে অন্যান্য গ্রুপের ফলাফল ও জটিল সমীকরণের ওপর।

শুরু থেকেই উত্তেজনার আগুন

ম্যাচের শুরুতেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের ইঙ্গিত দেয় দুই দল। দ্বিতীয় মিনিটে কর্নার থেকে কোরিয়া অধিনায়ক কিম মিন-জের শক্তিশালী হেড দক্ষিণ আফ্রিকার ডিফেন্ডার গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করলে বড় বিপদ থেকে রক্ষা পায় বাফানা বাফানারা।

এরপর অষ্টম মিনিটে পিএসজি তারকা লি কাং-ইনের দূরপাল্লার প্রচেষ্টা অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। প্রথম দিকে বলের নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণের ধার—দুই ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল দক্ষিণ কোরিয়া।

তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ছন্দ ফিরে পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ৩০ মিনিটে মফোকেন্গের দারুণ পাস থেকে ম্বাথার শট কোরিয়ান গোলরক্ষক সেউং-গিউ ঠেকিয়ে দেন। ফিরতি বলে মাকগোপার শটও দুর্দান্ত দক্ষতায় প্রতিহত করেন তিনি।

দুই দলের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠা প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্য সমতায়।

সন নামলেন, কিন্তু ইতিহাস লিখলেন মাসেকো

দ্বিতীয়ার্ধে গোলের খোঁজে মরিয়া হয়ে ওঠে দক্ষিণ কোরিয়া। ম্যাচের ৬০ মিনিটে ওহ হিয়োঙ্গুর শক্তিশালী হেড ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রুখে দেন দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞ গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস।

চাপ সামলেও সুযোগের অপেক্ষায় ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই সুযোগ আসে ৬৩ মিনিটে।

দ্রুতগতির এক কাউন্টার অ্যাটাকে বদলি খেলোয়াড় মোরেমির পাস কোরিয়ান ডিফেন্ডাররা পুরোপুরি ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে বল পেয়ে যান তাফেলো মাসেকো।

স্নায়ুচাপকে উপেক্ষা করে অসাধারণ ঠান্ডা মাথায় বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জালে পাঠিয়ে দেন তিনি।

আর তাতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বেঞ্চ ও সমর্থকরা। সেই এক গোলই শেষ পর্যন্ত ইতিহাস গড়ে দেয়।

শেষ মুহূর্তের লড়াই, কিন্তু সমতা ফেরাতে পারেনি কোরিয়া

গোল হজম করার পর পুরো দল নিয়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে দক্ষিণ কোরিয়া। ম্যাচের শেষ প্রায় আধঘণ্টা দক্ষিণ আফ্রিকার অর্ধেই কাটে।

একের পর এক আক্রমণ, ক্রস ও কর্নারে দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগকে চাপে রাখলেও কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায়নি কোরিয়ানরা।

যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে কাস্ট্রপের নিখুঁত ক্রসে জিনসেওব সামান্য পা ছোঁয়াতে পারলে হয়তো বদলে যেতে পারত পুরো গল্প। কিন্তু সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পরাজয়ই সঙ্গী হয় তাদের।

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই উচ্ছ্বাসে ভেসে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার শিবির। খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও সমর্থকদের চোখেমুখে তখন ইতিহাস স্পর্শ করার আনন্দ।

মেক্সিকোর দাপট, দক্ষিণ আফ্রিকার স্বপ্নযাত্রা

একই সময়ে অনুষ্ঠিত গ্রুপের অন্য ম্যাচে চেক প্রজাতন্ত্রকে ৩-০ গোলে পরাজিত করেছে স্বাগতিক মেক্সিকো। তিন ম্যাচের সবকটিতে জয় তুলে নিয়ে ৯ পয়েন্টে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা।

গ্রুপ ‘এ’-এর চূড়ান্ত অবস্থান:

দলম্যাচপয়েন্ট
মেক্সিকো
দক্ষিণ আফ্রিকা
দক্ষিণ কোরিয়া
চেক প্রজাতন্ত্র

মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা নিশ্চিত করেছে শেষ বত্রিশের টিকিট। দক্ষিণ কোরিয়ার ভাগ্য ঝুলে আছে অন্যান্য গ্রুপের ফলাফলের ওপর, আর চেক প্রজাতন্ত্র বিদায় নিয়েছে টুর্নামেন্ট থেকে।

দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য এটি কেবল একটি জয় নয়; এটি একটি প্রজন্মের স্বপ্নপূরণ, একটি জাতির গর্ব এবং বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের নতুন পরিচয় জানান দেওয়ার ঘোষণা।

মন্তেরেইয়ের সেই রাত তাই বাফানা বাফানাদের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বহুদিন।