ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ড মানেই হিসাব-নিকাশ, উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তার এক রোমাঞ্চকর মঞ্চ।
একই সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ চললে দর্শকদের জন্য সেটি যেন আরও কঠিন হয়ে ওঠে—কোন ম্যাচ দেখবেন আর কোনটির খোঁজ রাখবেন, সেই দোটানায় পড়ে যান ফুটবলপ্রেমীরা।
ঠিক এমনই এক নাটকীয় রাতের সাক্ষী হয়েছে বিশ্বকাপের ‘বি’ গ্রুপ। ভ্যাঙ্কুভারে সুইজারল্যান্ড ও কানাডার লড়াই, আর সিয়াটলে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং কাতারের মুখোমুখি হওয়া—দুটি ম্যাচই ছিল নকআউট পর্বের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে সব জটিল সমীকরণেরও অবসান ঘটে।
সহ-স্বাগতিক কানাডাকে ২-১ গোলে হারিয়ে পূর্ণ তিন পয়েন্ট অর্জন করে ‘বি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সুইজারল্যান্ড।
এই জয়ের মাধ্যমে টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে সুইসরা।
অন্যদিকে সিয়াটলে কাতারকে ৩-১ গোলে হারিয়েও সরাসরি শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে ওঠার আনন্দ করতে পারেনি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। কারণ, সমান ৪ পয়েন্ট অর্জন করলেও গোল ব্যবধানে কানাডার চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকায় গ্রুপের তৃতীয় স্থানেই থামতে হয়েছে বলকান অঞ্চলের দেশটিকে।
তবে সেরা তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলগুলোর একটি হিসেবে নকআউট পর্বে যাওয়ার সম্ভাবনা এখনও তাদের সামনে খোলা রয়েছে।
গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচ শেষে অপরাজিত থেকে ৭ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে অবস্থান করছে সুইজারল্যান্ড।
সমান ৪ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয়েছে কানাডা, আর সেই সঙ্গে দেশটির ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে স্বাগতিকরা।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সংগ্রহও ৪ পয়েন্ট হলেও গোল ব্যবধানের নিষ্ঠুর সমীকরণ তাদের স্বপ্নে ধাক্কা দিয়েছে। কানাডার গোল ব্যবধান যেখানে +৫, সেখানে বসনিয়ার গোল ব্যবধান -১।
ফলে অন্য গ্রুপগুলোর ফলাফলের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তাদের।
আর মাত্র ১ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তলানিতে থেকে বিশ্বকাপ মিশন শেষ করেছে কাতার।
এখন নকআউট পর্বের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিচ্ছে সুইজারল্যান্ড। আগামী ৩ জুলাই ভ্যাঙ্কুভারে শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে মাঠে নামবে তারা।
প্রতিপক্ষ হতে পারে ‘ই’, ‘এফ’, ‘জি’, ‘এইচ’, ‘আই’ অথবা ‘জে’ গ্রুপের তৃতীয় স্থান অর্জনকারী কোনো দল।
অন্যদিকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে না পারায় কানাডাকে এবার ঘরের মাঠের সুবিধা ছেড়ে বাইরে গিয়ে খেলতে হবে নকআউট ম্যাচ।
আগামী ২৮ জুন ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘এ’ গ্রুপের রানার্সআপ দলের বিপক্ষে মাঠে নামবে ইতিহাস গড়া কানাডা।
ভ্যাঙ্কুভারের ম্যাচে প্রথমার্ধে কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি। তবে বিরতির পর মাঠে নেমেই আক্রমণের ঝড় তোলে সুইজারল্যান্ড।
ম্যাচের ৪৬তম মিনিটে রুবেন ভারগাস দুর্দান্ত এক গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। এরপর ৫৪ মিনিটে ইয়োহান মানজাম্বি ব্যবধান দ্বিগুণ করলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নেয় সুইসরা।
স্বাগতিক দর্শকদের আশা জাগিয়ে ৭৬ মিনিটে একটি গোল শোধ করেন কানাডার ফরোয়ার্ড প্রমিজ ডেভিড। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি কেবল ব্যবধানই কমিয়েছে, ম্যাচের ফল বদলাতে পারেনি।
এই জয়ের মাধ্যমে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের পর বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসেবে টানা চারটি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠার কৃতিত্ব অর্জন করেছে সুইজারল্যান্ড।
অন্যদিকে সিয়াটলের ম্যাচ ছিল আরও বেশি গতিময় ও উপভোগ্য। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা।
ম্যাচের ২৯তম মিনিটে কেরিম আলাইবেগোভিচ গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। মাত্র পাঁচ মিনিট পর কাতারের গোলরক্ষক মাহমুদ আবুনাদার দুর্ভাগ্যজনক আত্মঘাতী গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ২-০।
তবে ম্যাচে ফিরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছিল কাতার। ৪২তম মিনিটে অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড হাসান আল-হেইদোস গোল করে ব্যবধান কমিয়ে আনেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি তাদের।
ম্যাচের ৮০তম মিনিটে বদলি খেলোয়াড় এরমিন মাহমিচ গোল করে বসনিয়ার জয় নিশ্চিত করেন। এরপর দুই দলই একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও আর কোনো গোল হয়নি।
শেষ পর্যন্ত এক রাতেই মিলেছে উল্লাস, ইতিহাস আর আক্ষেপের গল্প। সুইজারল্যান্ড নিশ্চিত করেছে গ্রুপসেরার মর্যাদা, কানাডা লিখেছে নতুন ইতিহাস, আর বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা রয়ে গেছে অপেক্ষার প্রহর গুনতে—সেরা তৃতীয় দল হিসেবে নকআউটের দরজা খুলবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

