back to top

কৃষকলীগের সভাপতি এখন কৃষক দলের সভাপতি দাবি করছেন! জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পুনর্বাসনের অভিযোগ

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬ ২৩:৩১

নিজস্ব প্রকিবেদক: ফ্যাসিস্ট  শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ যখন তীব্রতর হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা থেকে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর হামলাকারী এবং বিগত ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কৃষকলীগের সভাপতি হিসেবে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা এক ব্যক্তি এখন স্থানীয় কৃষক দলের সভাপতি দাবি করছেন—এমন অভিযোগ তুলেছেন খোদ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম মো: হোসেন মুজিব। বোয়ালখালী উপজেলার ৭ নং চরণদ্বীপ ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা এই ব্যক্তি বিগত প্রায় দেড় দশক ধরে স্থানীয় কৃষকলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকসহ সরকারের উচ্চপদস্থ দপ্তরে দাখিল করা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মো: হোসেন মুজিব বিগত ১৬ বছর ধরে এলাকায় বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তারের প্রাক্কালে তিনি স্থানীয় নেতাকর্মীদের বাড়ি চিহ্নিত করে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে তিনি নিজের আপন ভাই ও তার স্ত্রীর ওপরও শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছেন। এছাড়া জায়গা-জমি দখল, মৎস্য পুকুর দখল, সার ও কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা আত্মসাতের মতো অসংখ্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে তার নাম জড়িয়ে আছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। বর্তমানে বোয়ালখালী থানায় তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন, চাঁদাবাজি এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ অন্তত ৪টি মামলা ও ৪টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) রয়েছে বলে জানা গেছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি উঠেছে গত ২০২৪ সালের জুলাই মাসের অভ্যুত্থানকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানায় দায়ের করা বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের একটি মামলায় মো: হোসেন মুজিব এজাহারভুক্ত ৫ নম্বর আসামি। নগরীর ফিসারিঘাট এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর প্রকাশ্যে গুলি বর্ষণের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনার পর তিনি দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকলেও বর্তমানে তাকে বোয়ালখালীর ভেল্ট পয়েন্ট এলাকায় প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগকারীদের ভাষ্য।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের ক্ষোভের মূল কারণ হলো, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে সুবিধাভোগী মো: হোসেন মুজিব এখন নিজেকে ‘কৃষক দলের সভাপতি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, বোয়ালখালী উপজেলা কৃষক দলের এক প্রভাবশালী নেতার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তিনি নিজেকে বিএনপি বলয়ে ঢোকানোর কৌশল অবলম্বন করছেন। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য সরকারি কৃষি প্রণোদনা আবারও কুক্ষিগত করা।

অভিযোগকারী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ এবং অন্যান্য স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, “যে ব্যক্তি দলের নেতাকর্মীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে এবং জুলাইয়ের গণহত্যার সাথে জড়িত, তার স্থান বিএনপিতে হতে পারে না। তাকে দলের কোনো পদ বা প্রণোদনা পাইয়ে দেওয়ার অর্থ হলো শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা।”

ভুক্তভোগী নেতাকর্মীবৃন্দ এই পুরো বিষয়টি তদন্ত করে অভিযুক্ত মো: হোসেন মুজিব এবং তাকে সহযোগিতাকারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, কৃষিমন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর কেন্দ্রীয় দপ্তরেও এই স্মারকলিপি প্রদান করেছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ধরনের ‘ডিগবাজি’ বা দলবদল অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বাংলাদেশে পুরনো ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনর্বাসন দেশের স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বোয়ালখালীর এই ঘটনার সত্যতা যাচাই এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা।