এক দশকে শত বেআইনি ভবন বৈধ হলো প্রকৌশলী হাসানের কলমের খোঁচায়?

সিডিএ’তে এক যুগ ধরে চলা প্রশাসনিক প্রহসন-আসামি যখন ক্ষমতার শীর্ষাসনে!

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৪৭

চট্টগ্রাম নগরীর আকাশছোঁয়া ইমারতগুলোর দিকে তাকালে সাধারণ চোখ দেখে আধুনিকতার ছোঁয়া। কিন্তু নগর পরিকল্পনাবিদ ও অনুসন্ধানী চোখ দেখে অন্য এক ভয়াবহ সত্য-ইটের পর ইট গেঁথে তৈরি হওয়া হাজারো অনিয়ম, ইমারত বিধিমালা লঙ্ঘন আর বেআইনি তলা বৃদ্ধির গল্প।

আর এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে বারবার একটি নামই ঘুরেফিরে এসেছে-চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী ও সাবেক অথরাইজড অফিসার-১ মোহাম্মদ হাসান।

ফাইলে যার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে আদালতের চার্জশিট ঝুলে রয়েছে, দপ্তরে তিনিই ছিলেন নকশা অনুমোদনের সবচেয়ে অসীম ক্ষমতার মালিক।

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রহসন এখন নতুন করে সিডিএ’র পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

অভিযানের মুখে আইন, টেবিলে অপ্রতিহত ক্ষমতা

গল্পের শুরু ২০১০ সালে। কালুরঘাট সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নে সরকারি অর্থের ব্যাপক হরিলুটের অভিযোগ ওঠে।

ঠিকাদারদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে প্রায় ১ কোটি ৭৫ ২৮ হাজার ৪৫২ টাকা আত্মসাতের অপরাধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা রুজু করে।

চান্দগাঁও থানায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় দায়ের করা সেই মামলার তদন্ত শেষে ২০১২ সালের মে মাসে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়।

বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসানের বিরুদ্ধে ৪০/২০১২, ৪১/২০১২ এবং ৪৩/২০১২ নম্বর বিশেষ দুর্নীতি মামলা বিচারাধীন।

সাধারণ নিয়মে, রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি বিভাগীয় তদন্ত ও নজরদারির মুখে থাকেন। কিন্তু সিডিএতে ঘটেছিল তার ঠিক বিপরীত।

জামিন নিয়ে তিনি কেবল চাকরিতেই বহাল থাকেননি, বরং বাগিয়ে নেন সিডিএর অন্যতম সংবেদনশীল ও নীতি-নির্ধারণী পদ ‘অথরাইজড অফিসার-১’।

চার্জশিটভুক্ত আসামির হাতেই তুলে দেওয়া হয় চট্টগ্রাম নগরের প্রতিটি ভবনের নকশা ও প্ল্যান অনুমোদনের চূড়ান্ত চাবিকাঠি!

রাজনৈতিক ‘রক্ষাকবচ’ ও সিন্ডিকেটের অট্টালিকা

অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলজুড়ে-বিশেষ করে সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালামের দীর্ঘ দায়িত্বকালে সংস্থাটিতে এক অপরাজেয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বলয় গড়ে ওঠে। সেই বলয়ের মূল নির্বাহী ছিলেন প্রকৌশলী হাসান।

সিডিএর অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের মতে, তার কলমের এক খোঁচাতেই নিয়ম ভেঙে বহুতল ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, মূল নকশার আমূল পরিবর্তন কিংবা ত্রুটিপূর্ণ প্ল্যানের আইনি বৈধতা পাওয়ার পথ সুগম হতো।

নকশা সংশোধনের অজুহাতে গড়ে উঠেছিল এক অদৃশ্য ‘নকশা বাণিজ্য সিন্ডিকেট’। চান্দগাঁও থেকে বহদ্দারহাট, এমনকি বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার এলাকার একটি মসজিদের বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনে জটিলতা ও স্বজনপ্রীতিও এই বলয়ের অনিয়মের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে।

সুশীল সমাজের ক্ষোভ: নকশা অনুমোদনে প্রশাসনিক নমনীয়তা দেখানোর মাধ্যমে শত শত বেআইনি ভবনকে যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তা নগরের নিরাপত্তার জন্য এক স্থায়ী বোমার মতো।

অপরাধে অভিযুক্ত কর্মকর্তার হাতে এমন ক্ষমতা সঁপে দেওয়া ছিল একটি সরকারি সংস্থার চরম নৈতিক দেউলিযাত্ব।

বিলম্বে জাগা প্রশাসন: বরখাস্ত থেকে অপসারণ

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ‘অনাক্রম্যতা’ পেয়ে আসা এই ক্ষমতার সাম্রাজ্যে প্রথম বড় ধাক্কা লাগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তীব্র প্রতিবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সোচ্চার ভূমিকার কারণে।

প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়লে একের পর এক আইনি পদক্ষেপ কার্যকর হতে শুরু করে।

২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর সিডিএ চাকরি প্রবিধানমালার ৪০(ঙ) ধারা অনুযায়ী সচিব রবীন্দ্র চাকমা স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে মোহাম্মদ হাসানকে প্রথম সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

বরখাস্তের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে ‘অথরাইজড অফিসার-১’-এর দায়িত্ব থেকে চূড়ান্তভাবে সরিয়ে দেয়।

তাঁর স্থানে স্থলাভিষিক্ত করা হয় নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী কাদের নেওয়াজকে।

তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন-এক যুগের অনিয়ম আর জালিয়াতি কি কেবল একটি পদ অপসারণের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাবে?

বর্তমান কর্তৃপক্ষের অবস্থান ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

দুদকের দায়ের করা মামলাগুলোতে কেবল মোহাম্মদ হাসান একাই নন, সিডিএ’র বর্তমান ও সাবেক একাধিক প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলী অভিযুক্তের তালিকায় রয়েছেন। অর্থাৎ, অনিয়মের শিকড় বহু দূর ছড়িয়ে আছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা দাবি জানিয়েছেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে যারা এতদিন আইনের চোখ ফাঁকি দিয়েছেন, তাদের সবাইকে নিরপেক্ষ তদন্তের মুখোমুখি করতে হবে।

এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, “প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়টি আমিও শুনেছি। তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

আইন ও বিধি অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনিকভাবে কী করণীয়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।”

অন্যদিকে, এসব চাঞ্চল্যকর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসান বা তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত আইনি দিক থেকে কাউকে চূড়ান্ত অপরাধী বলা চলে না। কিন্তু চার্জশিটভুক্ত একজন আসামির হাতে টানা এক যুগ ধরে একটি বিভাগীয় শহরের কোটি কোটি টাকার নকশা অনুমোদনের ক্ষমতা তুলে দেওয়া কোন প্রশাসনিক নীতির মধ্যে পড়ে?

প্রকৌশলী হাসানকে পদ থেকে সরানো হয়তো প্রথম পদক্ষেপ, কিন্তু গত এক দশকে তাঁর ‘কলমের খোঁচায়’ যেসব বেআইনি ইমারত বৈধতা পেয়েছে, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও প্রাতিষ্ঠানিক অডিট না হলে সিডিএ’র ওপর জনগণের আস্থা ফেরানো অসম্ভব।

নগরীর সুপরিকল্পিত ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে আদালতের বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।