বাজার অস্থির, পকেট কাটার নতুন ফাঁদ সয়াবিন তেল?

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ১৯:৪৮

নিত্যপণ্যের বাজারে যখন সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরেনি, তখনই সয়াবিন তেলের দাম আবারও বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাজারে চাল, সবজিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি ও বন্যার প্রভাব নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে চাপের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার মধ্যেই সয়াবিন তেলের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা।

এমন পরিস্থিতিতে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে ব্যবসায়ীদের নানা অজুহাত ব্যবহারের প্রবণতা এবং সরকারের নীরব ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন।

তিনি বলেন, দেশের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময় নানা অজুহাতে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে থাকেন।

দাম বাড়ানোর সময় আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম কমলে তার প্রভাব দেশের বাজারে দেখা যায় না।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার কথা বলে একতরফাভাবে ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

এস এম নাজের হোসাইনের ভাষ্য, সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীরা অনেক দিন ধরেই অপেক্ষায় ছিলেন।

এর আগে ইরান যুদ্ধকে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি। এখন অতিসম্প্রতি আবারও সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব সামনে এসেছে।

ক্যাবের এই কেন্দ্রীয় নেতা মনে করেন, নিত্যপণ্যের বাজারে যখন একের পর এক চাপ তৈরি হচ্ছে, তখন নতুন করে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়াবে।

তাঁর অভিযোগ, বন্যার অজুহাতে সবজি ও চালের বাজারে ইতিমধ্যে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে ভোক্তাদের ওপর একসঙ্গে একাধিক দিক থেকে চাপ সৃষ্টি হবে।

এখানেই শেষ নয়। সয়াবিন তেলের বাজারে গুটিকয়েক আমদানিকারক ব্যবসায়ীর প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এস এম নাজের হোসাইন।

তাঁর অভিযোগ, অস্থির সময়ে সরকারকে বিব্রত করার সুযোগ নিয়ে কিছু আমদানিকারক ব্যবসায়ী কারসাজির মাধ্যমে দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার উদ্যোগ নিচ্ছেন।

তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে বাজার নিয়ন্ত্রণের একটি বড় প্রশ্নও, নিত্যপণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কতটা আছে?

এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সরকার নিত্যপণ্যের বাজারের পুরো দায়ভার ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিয়েছে।

ব্যবসায়ীরা যেভাবে চাইছেন, সেভাবেই সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে, আর সেখানে সরকার নীরব থাকছে।

তাঁর আশঙ্কা, এই পরিস্থিতিতে নতুন করে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হলে তা সাধারণ মানুষের জন্য ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়াবে।

কারণ, নিত্যপণ্যের ব্যয় ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু বাজারের ব্যাগেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা পরিবারের মাসিক বাজেট, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচেও সরাসরি আঘাত করে।

বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে রান্নার অন্যতম প্রধান উপকরণ সয়াবিন তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব দ্রুতই সামগ্রিক খাদ্যব্যয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিটি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারদর, শুল্ক-কর, পরিবহন ব্যয়, মজুত পরিস্থিতি ও সরবরাহব্যবস্থার বাস্তব চিত্র যাচাই করা জরুরি।

একই সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের বাজারে অল্পসংখ্যক আমদানিকারক বা ব্যবসায়ীর প্রভাব থাকলে সেখানে প্রতিযোগিতা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীদের ‘ফ্রিস্টাইলে’ দাম বাড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারকে এখনই উদ্যোগী হতে হবে।

তাঁর মতে, বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির লাগামহীন প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু ভোক্তার অর্থনৈতিক দুর্ভোগেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

এ অবস্থায় সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ঘিরে সরকারের দ্রুত ও স্বচ্ছ পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকৃত মূল্য পরিস্থিতি, দেশে আমদানি ব্যয়, মজুত ও সরবরাহের তথ্য এবং মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা প্রকাশ্যে যাচাই করা না হলে নতুন করে বাজারে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা থেকেই যাবে।

সাধারণ মানুষের প্রশ্নও তাই সরল—আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারে সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাব পড়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে সেই স্বস্তি ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না কেন?

সয়াবিন তেলের সম্ভাব্য নতুন মূল্যবৃদ্ধিকে ঘিরে এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই জরুরি।

একই সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, এটি সত্যিই আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি ব্যয়ের অনিবার্য প্রভাব, নাকি বাজারের অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি সুযোগ।

ক্যাবের অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি শুধু ভোক্তার পকেটের ওপর চাপের প্রশ্ন নয়. এটি বাজার ব্যবস্থাপনা, প্রতিযোগিতা, জবাবদিহি এবং নিত্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

তাই সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্যভিত্তিক যাচাই ও প্রয়োজনীয় তদন্ত এখন সময়ের দাবি।