লাখো মানুষের দৃষ্টির আলো ফিরিয়ে দেওয়া সেই কর্মবীর রবিউল হোসেনকে স্মরণ

প্রকাশিত: ০১ আগস্ট, ২০২৬ ২১:০৪

চোখের আলো ফিরিয়ে দেওয়ার মহান ব্রত নিয়ে আজীবন মানুষের পাশে থাকা উপমহাদেশের কিংবদন্তি চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনকে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আবেগে স্মরণ করলেন বিশিষ্টজনেরা।

তাঁর কর্মময় জীবন, মানবিক আদর্শ এবং মানুষের কল্যাণে রেখে যাওয়া অনন্য অবদানের স্মৃতিচারণে অনুষ্ঠিত হলো নাগরিক শোকসভা।

বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি (বিএনএসবি), চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (সিইআইটিসি), ইনষ্টিটিউট অফ্ কমিউনিটি অফথালমোলজী (আইসিও) এবং ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও স্মৃতিচারণে বিএনএসবি ও সিইআইটিসির উদ্যোগে শনিবার (১ আগস্ট) বিকেলে নগরের টাইগারপাস আমবাগান রোডস্থ নেভি কনভেনশন সেন্টারে এ নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়।

শোকসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এমপি বলেন, আজ যে মানুষটির স্মরণ সভায় সবাই উপস্থিত হয়েছি, সেই মানুষটি হলেন চক্ষু চিকিৎসা সেবায় এক অবিস্মরণীয় নাম অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন।

আমি মনে করি, চক্ষু চিকিৎসা সেবায় উজ্জ্বল নক্ষত্র কিংবদন্তি চক্ষু চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন একটি প্রতিষ্ঠান।

তিনি বলেন, মানুষের কল্যাণে এবং মানুষের কথা চিন্তা করে অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন আজীবন কাজ করে গেছেন। তাঁর আদর্শ ধারণ করে সবাইকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের মত মানুষ হয় না। তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তিনি আমাদের সবার হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকবেন।

অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনকে দেশের গর্ব হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি ছিলেন একজন সেরা চিকিৎসক ও সেরা ছাত্র। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি বাংলাদেশকে অনেক উপরে নিয়ে গেছেন।

চট্টগ্রামে চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের লাখো মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়ার মহান কাজ করেছেন। হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রামকে বিশ্বের মানচিত্রে তুলে ধরেছেন।

রবিউল হোসেনের মতো উদার ও দেশপ্রেমিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

তিনি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেও সেখানে নিজের নাম লেখাননি। নিজের কথা চিন্তা না করে হাসপাতাল পরিচালনার জন্য বোর্ড অব ট্রাস্ট করে দিয়ে গেছেন। তিনি ছিলেন একজন মহান কর্মবীর।

তিনি বলেন, অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন চলে গেলেও তাঁর স্বপ্নগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। সেই স্বপ্নকে সামনে রেখে সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে।

অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁর দুই সন্তান ডা. রাজীব হোসেন ও রিয়াজ হোসেন পিতার আদর্শে সুন্দরভাবে পরিচালনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তবে সেগুলো চালাতে সমাজের কোন অপশক্তি যেন তাদের গ্রাস করতে না পারে, সে দিকে আপনারা লক্ষ্য রাখবেন।

শোকসভায় গেষ্ট অফ অনারের বক্তব্যে চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান এমপি বলেন, অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন চাচা সমাজের জন্য অনেক কিছু উপহার দিয়েছেন। তাঁর প্লেজার এন্ড পেইন গ্রন্থে এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন রয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের কর্মকাণ্ড ও আদর্শ ধারণ করে আমরা যাতে সেই মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারি, সে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

সাঈদ আল নোমান বলেন, অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন যে চক্ষু হাসপাতাল দাঁড় করিয়েছেন, চট্টগ্রামের কোথাও এমন সহজলভ্য চিকিৎসা সেবা নেই। দেশের আটটি জেলায় তিনি এমন চক্ষু হাসপাতাল দাঁড় করিয়েছেন। এমন মহান মানুষের প্রতি তিনি শ্রদ্ধা জানান।

মাওলানা মো. মেজবাহ উদ্দিনের কোরআন তেলওয়াাতের মাধ্যমে নাগরিক শোকসভার সূচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সিইআইটিসি’র ম্যানেজিং ট্রাস্টি ডা. কিউ.এম. অহিদুল আলম।

আইসিও’র পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. মো. মনিরুজ্জামান ওসমানীর উপস্থাপনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সিইআইটিসি ট্রাস্টের ট্রেজারার মোহাম্মদ রেজওয়ান শাহিদী।রবিউল হোসেন

সভায় বক্তব্য রাখেন চক্ষু চিকিৎসা সমিতির উপদেষ্টা গোলাম মোস্তফা শামীম, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আরিফুর রহমান, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ছিদ্দীক স্যার, সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চেয়ারম্যান নাদের খান, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান শিরিন পারভীন হক, ইসলামিয়া হাসপাতাল ঢাকার মো. ফয়সাল সাহেদ, ময়মনসিংহ বিএনএসবি কে জামান হাসপাতালের চীফ কনসালটেন্ট ডা. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া, অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের দুই পুত্র-সিইআইটিসি’র মেডিকেল ডিরেক্টর ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাজীব হোসেন এবং সিইআইটিসি’র ট্রাস্ট বোর্ডের সদস্য রিয়াজ হোসেন, ফয়েজলেকের মো. মহিউদ্দিন, ডা. মেরাজুল ইসলাম ভূঁইয়া, ডা. সোমা রানী রায়, কেন্দ্রীয় ওএসবির মহাসচিব অধ্যাপক ডা. জিন্নুরাইন নিউটন, ডা. আবু নাসেরসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ।

বক্তাদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের চিকিৎসকসত্তা, মানবিকতা, দেশপ্রেম, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার নিরলস প্রয়াস।

তাঁর হাতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল চিকিৎসাসেবার কেন্দ্র নয়, বরং মানবকল্যাণের অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেন বক্তারা।

তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়েই এই কিংবদন্তি চিকিৎসকের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন সম্ভব-এমন প্রত্যয়ও উঠে আসে নাগরিক শোকসভায়।

উক্ত নাগরিক শোকসভা পরিচালনায় সার্বিক সহযোগিতা করেন আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. রুকনুন চৌধুরী এবং আয়োজক কমিটির সদস্য ও চক্ষু হাসপাতালের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব ও অর্থ) মো. গোলাম ফারুক।

মানুষের চোখে আলো ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মানুষের হৃদয়ে যে মানবিকতার আলো জ্বেলে গেছেন অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন, তাঁর কর্ম ও আদর্শের সেই আলোই যেন আগামী দিনের পথচলার প্রেরণা হয়ে থাকে-নাগরিক শোকসভায় এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেন উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা।