চট্টগ্রামের মানুষের ঘরে যে পানি পৌঁছায়, সেই পানির দামই যেন বারবার হয়ে উঠছে নতুন দুশ্চিন্তার কারণ।
একবারে ৩৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলানোর পর এবার আবারও গ্রাহক পর্যায়ে পানির দাম ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসার রাজস্ব বিভাগ।
অর্থাৎ, পানির কল খুললেই যে মৌলিক প্রয়োজন মেটে, সেই প্রয়োজনটিও এবার আরও ব্যয়বহুল হওয়ার পথে।
তবে শনিবার অনুষ্ঠিত ওয়াসা বোর্ড সভায় তাৎক্ষণিকভাবে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়নি।
বরং গ্রাহকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য গঠন করা হয়েছে চার সদস্যের একটি কমিটি।
প্রশ্নটি তাই শুধু পানির দাম বাড়বে কি না-এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হলো, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যয় বাড়ার প্রতিটি চাপের শেষ গন্তব্য কি সাধারণ গ্রাহকের পকেট?
বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম ১৮ টাকা। বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে তা ৩৭ টাকা।
রাজস্ব বিভাগের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে উভয় শ্রেণির গ্রাহকের ওপরই নতুন করে ৫ শতাংশ বাড়তি ব্যয়ের চাপ পড়বে।
আর এই চাপের সবচেয়ে বড় শিকার হওয়ার আশঙ্কা সাধারণ গৃহস্থালি গ্রাহকদের।
কারণ ওয়াসার সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থাটির মোট গ্রাহক সংযোগ ১ লাখ ৪ হাজার ৫১১টি। এর মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশই আবাসিক গ্রাহক।
অর্থাৎ, মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এর অভিঘাত মূলত ছড়িয়ে পড়বে চট্টগ্রামের বিপুলসংখ্যক সাধারণ পরিবারের ওপর।
৩৮ শতাংশের ধাক্কার পর ফের ৫ শতাংশ
চট্টগ্রাম ওয়াসা সর্বশেষ ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে পানির দাম বাড়ায়। তখন এক দফায় ৩৮ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করা হয়।
এর আগে একই বছরের জানুয়ারিতেও দাম বাড়িয়ে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি এক হাজার লিটার পানির মূল্য ১৩ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৩১ টাকা ৮২ পয়সা করা হয়েছিল।
মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও সেপ্টেম্বরে আসে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি।
এরপরও পানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কয়েকবার। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। এবার নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু করেছে ওয়াসা।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ২০২২ সালের ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধির পরও কেন আবার গ্রাহকের ঘাড়ে নতুন মূল্যবৃদ্ধির চাপ?
এক দশকে পানির দামে বড় উল্লম্ফন
ওয়াসার নিজের তথ্যই বলছে, সময়ের সঙ্গে পানির দাম কতটা বেড়েছে। ২০০৯ সালে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম ছিল ৫ টাকা ৪১ পয়সা। বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ছিল ১৫ টাকা ৩২ পয়সা।
২০১৪ সালে তা বেড়ে আবাসিকে দাঁড়ায় ৬ টাকা ৯০ পয়সা এবং বাণিজ্যিকে ১৯ টাকা ৫৯ পয়সা।
২০২০ সালে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১২ টাকা ৪০ পয়সা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৩০ টাকা ৩০ পয়সা।
এরপর ২০২২ সালের জানুয়ারিতে আবারও দাম বাড়িয়ে আবাসিকে ১৩ টাকা ও বাণিজ্যিকে ৩১ টাকা ৮২ পয়সা করা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে আবারও দাম বাড়ানো হয়।
বর্তমানে সেই মূল্য দাঁড়িয়েছে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ১৮ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৩৭ টাকা।
এবার তার ওপর আরও ৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব।
অর্থাৎ, পানির দাম বৃদ্ধির এই ধারাবাহিকতা গ্রাহকের ব্যয় বাড়তে থাকার একটি ধারাবাহিক চিত্র।
ওয়াসার যুক্তি-উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে
মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ওয়াসার যুক্তিও রয়েছে। ওয়াসার ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আগে সংস্থাটির অধিকাংশ পানি সরবরাহ হতো গভীর নলকূপ থেকে।
কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ধীরে ধীরে গভীর নলকূপ বন্ধ করা হচ্ছে। এখন সরবরাহের বড় অংশ আসছে নদীর পানি পরিশোধন করে।
আর নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি বড় আর্থিক বাস্তবতা-ওয়াসার বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প বিদেশি ঋণের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব ঋণের কিস্তি পরিশোধের দায়ও রয়েছে সংস্থাটির।
ওয়াসার কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং ঋণ পরিশোধে আর্থিক চাপ এড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব আনা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন-ওয়াসার উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে,তার দায় কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকের ওপর বর্তাবে?
আইন অনুযায়ী বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে বছরে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত পানির দাম বাড়ানো যায়। এর বেশি বাড়াতে হলে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
এই বিধান অনুযায়ী আবাসিক ও বাণিজ্যিক-উভয় শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব তোলে ওয়াসার রাজস্ব বিভাগ।
কিন্তু শনিবারের বোর্ড সভায় সরাসরি অনুমোদনের পথে যায়নি ওয়াসা।
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় আলোচনার পর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বিষ্ণু কুমার দে’কে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে এবং বোর্ড সদস্য বেগম সৈয়দা জেরিন হোসেন ও রাসেল মিয়া।
পরবর্তী বোর্ড সভার আগে তাঁরা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি ও গ্রাহকদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সুপারিশ দেবেন। অর্থাৎ, এবার অন্তত মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের আগে গ্রাহকের বক্তব্য শোনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
‘৫ শতাংশ’ শুনতে ছোট, অভিঘাত কিন্তু বড়
শতকরা হিসাবে ৫ শতাংশ হয়তো খুব বড় সংখ্যা নয়। কিন্তু যে পরিবারকে প্রতিমাসে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, বাসা ভাড়া, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অসংখ্য ব্যয় সামলাতে হয়, তাদের জন্য প্রতিটি বাড়তি টাকা হিসাবের বিষয়।
আর পানি এমন কোনো পণ্য নয়, যার ব্যবহার সহজেই বন্ধ করে দেওয়া যায়।
মানুষ পানি কম ব্যবহার করতে পারে, অপচয় কমাতে পারে, কিন্তু পানির প্রয়োজন এড়িয়ে যেতে পারে না।
এই বাস্তবতাই পানির মূল্যবৃদ্ধিকে অন্য অনেক পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে আলাদা করে।
তার ওপর ওয়াসার মোট গ্রাহকের প্রায় ৯৩ শতাংশ আবাসিক। ফলে নতুন মূল্যবৃদ্ধির অর্থ যুক্ত হবে বিপুলসংখ্যক পরিবারের মাসিক ব্যয়ের নতুন হিসাব।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মো. জানে আলম বলেছেন, আইন অনুযায়ী প্রতিবছর ৫ শতাংশ পর্যন্ত পানির দাম বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। রাজস্ব বিভাগ থেকে সে অনুযায়ী একটি প্রস্তাব এসেছে।
তবে বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব পক্ষের মতামত জানতে চায়। কমিটি বিভিন্ন পেশাজীবী ও গ্রাহক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ দেবে। সে অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই বক্তব্যের পর এখন নজর থাকবে চার সদস্যের কমিটির দিকে। তাঁরা কি শুধু মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি শুনবেন, নাকি গ্রাহকের সামর্থ্য, পানির গুণগত মান, সরবরাহের ধারাবাহিকতা, উৎপাদন ব্যয়ের প্রকৃত হিসাব এবং ওয়াসার আর্থিক ব্যবস্থাপনাও খতিয়ে দেখবেন?
কারণ পানির দাম বাড়ানোর প্রশ্নে শুধু ‘আইনে সুযোগ আছে’-এই ব্যাখ্যাই যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন হলো, সেই সুযোগ প্রয়োগের আগে গ্রাহকের ওপর তার আর্থিক অভিঘাত কতটা, এবং ওয়াসার ব্যয় বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ ও হিসাব কতটা স্বচ্ছ।
চট্টগ্রাম ওয়াসা যদি নদীর পানি পরিশোধনের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কথা বলে, তাহলে সেই উৎপাদন ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব কি জনসমক্ষে দেওয়া হবে?
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ৩৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির পর এবার আরও ৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব তাই কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এটি চট্টগ্রামের ১ লাখ ৪ হাজার ৫১১ গ্রাহক সংযোগের সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবনযাত্রার প্রশ্ন।
বিশেষ করে প্রায় ৯৩ শতাংশ আবাসিক গ্রাহকের জন্য এটি হয়ে উঠতে পারে নতুন আর্থিক চাপের নাম। এখন সিদ্ধান্তের ভার ওয়াসা বোর্ডের।
