যে বনভূমি ছিল জবরদখলে, সেখানেই এবার বাঁশের সবুজ প্রতিরোধ

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ১৮:৫৬

লোহাগাড়া প্রতিনিধি :  চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় চুনতি রেঞ্জের সাতগড় বিটে এক একর বনভূমি জবরদখলমুক্ত করে বাঁশসহ দেশীয় প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।

বন বিভাগের ভাষ্য, হাতির আবাসস্থলে খাদ্যসংকট কমিয়ে বন্যহাতিকে বনের ভেতরে ধরে রাখা এবং হাতি-মানুষ সংঘাত কমাতেই এই উদ্যোগ।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতি রেঞ্জের আওতাধীন সাতগড় বিটের সাতের আগা।

একসময় ২০০২-০৩ সালের বাঁশ বাগানের বনভূমির অংশ হিসেবে থাকা এই জায়গা জবরদখলে চলে গিয়েছিল। সেই বনভূমি দখলমুক্ত করার পর এবার সেখানে ফিরছে সবুজ। এক একর জায়গাজুড়ে রোপণ করা হয়েছে বাঁশসহ দেশীয় প্রজাতির গাছের চারা।

২৭ জুলাই (সোমবার) সকালে বন বিভাগের উদ্যোগে এই বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

এ সময় চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা আবির হাসান, সাতগড় বিট কর্মকর্তা বজলুর রশিদ, বনবিভাগের স্টাফবৃন্দ, বাঁশ বাগানের অংশীদার ও অনিয়মিত শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন।

তবে এই উদ্যোগকে শুধু বৃক্ষরোপণ হিসেবে দেখছেন না বন বিভাগের কর্মকর্তারা। তাঁদের দৃষ্টিতে, বনভূমি পুনরুদ্ধার, বন্যপ্রাণীর খাদ্য নিশ্চিত করা এবং মানুষের সঙ্গে বন্যহাতির সংঘাত কমানোর সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা আবির হাসান বলেন, বিদেশি প্রজাতির পরিবর্তে দেশীয় গাছ রোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব। পাশাপাশি পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

বন বিভাগের এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে বন্যহাতিকে ঘিরে।

আবির হাসানের ভাষ্য, বন্যহাতির অন্যতম প্রধান ও প্রিয় খাবার হলো বাঁশ। হাতির আবাসস্থলে খাদ্যসংকট দেখা দিলে বনের বাইরে মানুষের বসতিতে হাতির বিচরণ বাড়তে পারে। সেই ঝুঁকি কমাতে বনের ভেতরেই হাতির উপযোগী খাদ্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বন বিভাগ।

তিনি বলেন, হাতির আবাসস্থলে খাদ্যসংকট দূর করতে এবং হাতিকে বনের ভেতরে ধরে রাখতে বাঁশ বাগান ও উপযোগী বুনো গাছের চারা রোপণ করা হয়। এর ফলে হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে সহায়তা করে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে চুনতি সাতগড় বিটের সাতের আগা নামক স্থানে ২০০২-০৩ সালের বাঁশ বাগানের বনভূমি জবরদখলমুক্ত করে বাঁশসহ দেশীয় প্রজাতির গাছের চারা রোপণকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্টরা। বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বনভূমি উদ্ধারের পর সেখানে দেশীয় গাছ ও বাঁশের চারা রোপণের উদ্যোগ স্থানীয় সচেতন মহলেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

তাঁদের মতে, জবরদখল হওয়া বনভূমি উদ্ধার করে সেখানে আবারও বাঁশ ও দেশীয় প্রজাতির গাছ ফিরিয়ে আনা সময়োপযোগী উদ্যোগ। এতে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং মাটির স্বাস্থ্যও ভালো থাকবে।

সাতের আগার এই উদ্যোগ তাই কেবল একটি এক একর জায়গায় চারা রোপণের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বনভূমি পুনরুদ্ধার, দেশীয় উদ্ভিদ ফিরিয়ে আনা, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং হাতির খাদ্যনিরাপত্তার মতো একাধিক বিষয়।

বিশেষ করে চুনতি অঞ্চলে বন্যহাতির বিচরণ ও মানুষের সঙ্গে সংঘাতের বাস্তবতায় বনের ভেতর হাতির খাদ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ, বনভূমি শুধু গাছের সমষ্টি নয়, এটি একই সঙ্গে বন্যপ্রাণীর আবাস, খাদ্যের উৎস এবং একটি বৃহত্তর পরিবেশব্যবস্থার অংশ।

সাতের আগায় দখলমুক্ত বনভূমিতে বাঁশ ও দেশীয় গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে সেই পরিবেশব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বন বিভাগের চলমান এই কার্যক্রম ভবিষ্যতে কতটা টেকসই হয়, তার ওপর নির্ভর করবে বনভূমি পুনরুদ্ধারের এই প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে।