বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেলের উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. সানাউল হকের বিরুদ্ধে নথিপত্র জালিয়াতি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:৩৭

নিজস্ব প্রতিবেদক:
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেলের উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. সানাউল হকের বিরুদ্ধে নথিপত্র জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। সাবেক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এই কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের ও আত্মীয়স্বজনের নামে একাধিক ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার এফডিআর এবং একাধিক ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবে দুদক কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে তিনি পার পেলেও বর্তমানেও একইভাবে দাপটের সঙ্গে দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডিজিটাল সেবায় অনীহা ও ম্যানুয়াল ঘুষ বাণিজ্য

সেবা সহজীকরণের অংশ হিসেবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ অনলাইনে ফি পরিশোধ ও স্বচ্ছতার নির্দেশনা জারি করলেও চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেলের (বায়েজিদ বালুচরা) কার্যালয়ে তা সম্পূর্ণ অকার্যকর। ২০২৩ সালের ২৩ মে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে ফি পরিশোধ করে ফাইল জমা দিলেও তা দিনের পর দিন ফেলে রাখা হয়।

দখলদার এই সিন্ডিকেটের অনুমোদন বা ‘সেটেল’ না হলে কোনো ফাইলই কার্যকর হয় না। অথচ দালালদের হাত ঘুরে আসা ‘বিশেষ চিহ্নিত’ ফাইল মুহূর্তেই নিষ্পত্তি পায়। অফিসটির ভেতরে কিছু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বাইরে সক্রিয় বহিরাগত দালালদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা এই শক্তিশালী চক্রটি ডিজিটাল সেবার পথ রুদ্ধ করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ঘুষ আদায় করছে।

যাদের নেতৃত্বে চলছে সিন্ডিকেট

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই অবৈধ অর্থ লেনদেনের মূল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. সানাউল হক এবং জেলা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সলিম উল্যাহর হাতে। মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি করেন সহকারী মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল মতিন এবং জেলা রেজিস্ট্রেশন শাখার টিপু সুলতান।

এছাড়াও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কিছু কর্মচারী এবং বহিরাগতদের মধ্যে অফিস সহকারী পিয়ন খোরশেদ আলম, নৈশপ্রহরী লিটন ও বহিরাগত ক্যাশিয়ার রুবেলের প্রভাব লক্ষণীয়। অস্থায়ী কর্মী হয়েও লিটন রেজিস্ট্রেশন ও মালিকানা পরিবর্তন সেকশন নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং ভুয়া কাগজপত্র তৈরিসহ গুরুতর জালিয়াতিতে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
পূর্বে সিলেট ও ঢাকার ইতিহাস

উপ-পরিচালক সানাউল হকের প্রশাসনিক রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা তাঁর জন্য নতুন নয়। এর আগে সিলেট ও ঢাকার মিরপুর কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালেও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে ২০২২ সালে সিলেটে তাঁর প্রশ্রয়ে পরিচালিত দালালচক্র ও ঘুষ বাণিজ্যের প্রতিবাদে ‘সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’ ধর্মঘটের ডাক দিলে পুরো অঞ্চল স্তব্ধ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে জনদুর্ভোগ ও শ্রমিক অসন্তোষের মুখে তাঁকে সিলেট থেকে প্রত্যাহার করা হলেও চট্টগ্রামে এসে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

প্রকাশ্যে ‘রেটকার্ড’ বাণিজ্য

পরিবহন সংগঠন ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই সার্কেলে প্রতিটি সেবার বিপরীতে চলছে একটি অদৃশ্য রেটকার্ড:

ড্রাইভিং লাইসেন্স: পরীক্ষা ছাড়া ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা; সাধারণ প্রক্রিয়ায় ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকা অতিরিক্ত।

বাসের রুট পারমিট ও ফিটনেস: আকারভেদে ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা।

হিউম্যান হলার ও লেগুনা: ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকা।

ট্রাক ও ড্রাম ট্রাক: ২,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা।

সিএনজি অটোরিকশা: ৪০০ থেকে ১,০০০ টাকা।

অন্যান্য: নম্বরপ্লেট সংগ্রহ, মালিকানা বদল ও শারীরিক পরিদর্শন ছাড়াই অতিরিক্ত অর্থ আদায়।

অক্সিজেনের লেগুনা চালক মহিদুল ও অলংকারের সিএনজি চালক স্বপনসহ একাধিক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়েও বৈধ উপায়ে কাজ শেষ করা যায় না, অথচ দালালকে টাকা দিলেই আধঘণ্টায় সব কাজ সম্পন্ন হয়।

এ বিষয়ে উপ-পরিচালক সানাউল হক ও রাজস্ব কর্মকর্তা সলিম উল্যাহর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রশ্ন পাঠানো হলেও এই প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে যুক্ত করা হবে।
আইনি লঙ্ঘন ও জননিরাপত্তার ঝুঁকি

পেনাল কোডের ১৬১/১৬২ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা অনুযায়ী সরকারি পদে থেকে অসদুপায়ে অর্থ গ্রহণ বা ক্ষমতার অপব্যবহার গুরুতর অপরাধ। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর উদ্দেশ্যকে পুরোপুরি ভেস্তে দিয়ে এই সিন্ডিকেট পরীক্ষা ছাড়া সনদ বিক্রি করে সরাসরি অদক্ষ চালক ও ত্রুটিযুক্ত গাড়ি রাস্তায় নামার বৈধতা দিচ্ছে, যা জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
বিশেষ প্রতিবেদন: ওবায়দুল কাদেরের আস্থাভাজনের দুর্নীতি সাম্রাজ্য

বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের আস্থাভাজন এবং চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেলের উপ-পরিচালক প্রকৌশলী সানাউল হক দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ব্যাংকে এফডিআর ও একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক হলেও তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে সব অভিযোগ ধামাচাপা দিয়ে নিজস্ব বলয় তৈরি করেছেন। চট্টগ্রাম মেট্রো-২ বিআরটিএ কার্যালয়কে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করা এই কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদের সুষ্ঠু অনুসন্ধানপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রামের ভুক্তভোগী জনসাধারণ ও সচেতন মহল।