ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং খাতের একটি বড় নাম আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। দীর্ঘদিন ধরে মালিকানায় এস আলম গ্রুপ থাকলেও নিয়ন্ত্রণে ছিল কেডিএস গ্রুপ—এমন অভিযোগ নতুন নয়।
এ ব্যাংকে কাগজে-কলমে বিনিয়োগ ও ঋণ বিতরণের হিসাব যতটা স্বাভাবিক দেখায়, বাস্তব চিত্র ততটাই প্রশ্নবিদ্ধ—এমন অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ঘিরে।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ, খেলাপি বৃদ্ধি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে কেডিএস পরিবারের কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তির নাম সামনে এসেছে।
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকটির গুলশান শাখা থেকে শত শত কোটি টাকা ঋণের নামে বের করে নেওয়া হয়।
পরে সেই অর্থের বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম রহমান ও তার ভগ্নিপতি, ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এস এম শামীম ইকবালের নাম ঘুরেফিরে আসছে।
ঋণের আড়ালে অর্থ সরানো :
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, ২০১৭ সালের শেষ দিকে বনানী শাখায় এফ এম এগ্রো ফুডস লিমিটেডের নামে একটি চলতি হিসাব খোলা হয়।
২০১৮ সালে তা গুলশান শাখায় স্থানান্তর করা হয়। (হিসাব নং ০৫৪১০২০০০৬৭৯৬)। এই হিসাবের বিপরীতে প্রথম ধাপে ৩৫ কোটি টাকার ঋণসীমা অনুমোদন করা হয়।
পরবর্তী সময়ে একই গোষ্ঠীর আরেক প্রতিষ্ঠান জেকটা লিমিটেডকে (হিসাব নং ০৫৪১০২০০০০০৫১) যুক্ত করে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়ানো হয়।
ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান দুটির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ মূলত এস এম শামীম ইকবাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হাতে।
তথ্য সূত্র বলছে, এস এম শামীম ইকবাল প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল সিইও হিসাবে নিজেকে পরিচয় দিলেও প্রতিষ্ঠানের মালিকানায়/শেয়ারহোল্ডার হিসাবে রয়েছে জেকটা লিমিটেড। এই জেকটা লিমিটেড এফ এম এগ্রো ফুড লিমিটেড এর ৮৯% শেয়ারের মালিক।
উল্লেখ্য, জেকটা লিমিটেড এর শেয়ারহোল্ডার হিসাবে এসএম শামীম ইকবালের ৫১.৯৪%, ছেলে এসএমএস জাইফ ইকবাল ৩৩.৫৮% এবং শামীম ইকবালের বোন মিসেস শামশাদ বেগম রহমান ১০% শেয়ারের মালিক। অর্থাৎ এফএম এগ্রো লিমিটেডের নেপথ্য মালিক এসএম শামীম ইকবাল।
কেডিএস গ্রুপের এমডি সেলিম রহমান তার নিজস্ব প্রভাব খাটিয়ে শামীম ইকবালের সহযোগিতায় এফ এম এগ্রো লিমিটেড এর মাধ্যমে বিপুল অংকের টাকা ব্যাংক থেকে সরিয়ে নেন।
২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে এই ঋণ নবায়ন করা হয় এবং সীমা বাড়ানো হয়।
প্রতিষ্ঠান দুটির অনুকূলে প্রদত্ত ঋণের একটি টাকাও ব্যাংকে ফেরত তো আসেনি বরং প্রদত্ত ২০.০০ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টির ব্যাংক ফোর্সড লোন সৃষ্টির মাধ্যমে পরিশোধে বাধ্য হয়। এই সময়টিতেও সেলিম রহমান ইসি চেয়ারম্যান ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সময়ে সেলিম রহমান ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। যা ঋণ অনুমোদনে প্রভাব ফেলেছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
খেলাপির বোঝা :
ব্যাংকের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিভিন্ন বিনিয়োগ পণ্যের আওতায় নেওয়া বড় অঙ্কের ঋণ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালে গুলশান শাখা থেকে বাই-মুয়াজ্জাল (জেন) বিনিয়োগ প্রডাক্ট থেকে গৃহীত ৭ কোটি টাকা ঋণের স্থিতি বর্তমানে দাড়িয়েছে ৮.৭০ কোটি টাকায়।
এইচপিএসএম শিল্প, মেশিনারি, মুরাবাহা টিআরসহ বিভিন্ন প্রডাক্ট থেকে গৃহীত ঋণের পরিমাণ ১৩৫.৫০ কোটি টাকা মুনাফাসহ বর্তমান স্থিতি ১৬৪.৭৫ কোটি টাকা।
শুধু মুরাবাহা টিআর খাতে ১৩৪টি ডিলের মাধ্যমে গৃহীত ঋণের পরিমাণ ৭৭.৩৮ কোটি টাকা যার মুনাফাসহ বর্তমান স্থিতি ৯৬.৮৮ কোটি টাকা। কোন টাকা পরিশোধ না করায় এই ৯৬.৮৮ কোটি টাকার পুরো অর্থই খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত।
জেকটা লিমিটেডের অনুকূলে গৃহীত ৪১.৪৮ কোটি টাকার মুনাফাসহ বর্তমান পাওনা ৫০.৯৮ কোটি টাকার বেশিরভাগ ডিলই খেলাপী হয়ে গেছে।
এ ছাড়া অন্যান্য খাত মিলিয়ে শত কোটি টাকার বেশি ঋণ অনাদায়ী রয়েছে। জেকটা লিমিটেডের বিপরীতে নেওয়া ঋণের বড় অংশও একই অবস্থায়।
হুন্ডির মাধ্যমে পাচারের অভিযোগ :
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঋণের অর্থের বড় অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। সেই অর্থ দিয়ে কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কানাডার অন্টারিও প্রদেশের নর্থ ইয়র্ক এলাকায় প্রায় ১৪০ কোটি টাকা মূল্যের একটি বাড়ি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বাড়িটির ছবি ছড়িয়ে পড়েছে।
আইনি পদক্ষেপ ও নিষেধাজ্ঞা :
২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে এস এম শামীম ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী হাসিনা ইকবালের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
এদিকে, কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান অতীতে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালক থাকাকালে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের একাধিক মামলার আসামি।
তিনি সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। একই পরিবারের আরেক সদস্য এস এস আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
নীরব কেডিএস :
তবে এসব অভিযোগ সত্ত্বেও কেডিএস পরিবারের বিরুদ্ধে জনপরিসরে আলোচনা তুলনামূলক কম। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এস আলম গ্রুপকে ঘিরে বিতর্কের আড়ালে কেডিএস গ্রুপ নিজেদের গোপন রাখতে সক্ষম হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে নানাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেডিএস গ্রুপের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রামে তাদের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতে এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে বড় অঙ্কের অর্থ পাচার ও প্রভাব খাটিয়ে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত না হলে আর্থিক খাতের ঝুঁকি আরও বাড়বে। আমানতকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

