চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস–লালখান বাজার এলাকায় জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মোছাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
দেয়ালের আঁকিবুঁকি মুছে যাওয়ার অভিযোগ থেকে শুরু হয়ে তা পৌঁছেছে সরাসরি রাজনৈতিক আক্রমণ, পাল্টাপাল্টি বিষোদ্গার ও শক্তি প্রদর্শনে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল ও মিটিং নিষিদ্ধ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
আরও পড়ুন
সোমবার সকাল থেকে টাইগারপাস, লালখান বাজার ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও পয়েন্টে বাড়ানো হয় টহল। নগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে চাপা আতঙ্ক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা।
সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সবাইকে আইন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এর আগে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৮ মে থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট ফ্লাইওভার পর্যন্ত এলাকায় কোনো ধরনের জনসমাবেশ, মিছিল বা সভা করা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
বিতর্কের সূত্রপাত নগরের বিভিন্ন স্থানে জুলাই আন্দোলনের স্মারক গ্রাফিতি মুছে যাওয়ার অভিযোগে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অভিযোগ তোলে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের আড়ালে পরিকল্পিতভাবে আন্দোলনের স্মৃতি মুছে ফেলা হচ্ছে।
রোববার রাত ৯টার দিকে নগর ভবনের প্রবেশমুখ বন্ধ করে দেয় এনসিপির নেতা-কর্মীরা। পরে সেখানে রংতুলিতে লেখা হয়—‘জুলাইয়ের গাদ্দার, হুঁশিয়ার সাবধান’। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলারেও লেখা হয়—‘শাহাদাত ডাক্তার, জুলাইয়ের গাদ্দার’।
এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরের সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন সরাসরি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে দায়ী করে বলেন, ‘বর্তমান মেয়র হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ মেয়র। কিন্তু উনার ব্রেনের মেয়াদ চলে গেছে সেটা আমরা জানতাম না।’
তিনি অভিযোগ করেন, একের পর এক গ্রাফিতি মুছে ফেলা হচ্ছে এবং ‘বিপ্লব উদ্যান’ পর্যন্ত দখল করে সেখানে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘উনার চিকিৎসা করা দরকার।’
রাতেই পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন অভিযোগগুলোকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেন।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় প্রথম শহিদ ওয়াসিম আকরাম তাঁর ‘অনুসারী’ ছিলেন এবং আন্দোলনের সময় তিনি নিজেও হামলা–নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মেয়রের ভাষায়, ‘আমার ১৬টা গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর চাইতে বেশি সাফারার জুলাই-আগস্টে আর কেউ হয়নি।’
গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা পোস্টার অপসারণ করতে গিয়ে কিছু গ্রাফিতি ঢেকে ফেলেছিল। পরে সেগুলো নান্দনিকভাবে পুনরায় আঁকার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, নগরের অধিকাংশ গ্রাফিতিই তাঁর ব্যক্তিগত অর্থায়নে করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, ‘করপোরেশন টাকা না দিলে আমি নিজের পকেট থেকে দেব।’
কিন্তু একই সঙ্গে এনসিপির নেতা আরিফ মঈনুদ্দিনকে ‘বিতর্কিত’ আখ্যা দিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে শহরকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা চলছে। তাঁর ভাষায়, ‘রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করছে সে।’
চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুধু গ্রাফিতি মোছা বা দেয়াললেখা নিয়ে নয়; এর ভেতরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতীক, স্মৃতি ও বয়ান এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির দখলযুদ্ধে পরিণত হয়েছে।
এনসিপি যেখানে ‘জুলাইয়ের চেতনা’ রক্ষার প্রশ্ন তুলছে, সেখানে বিএনপির ঘনিষ্ঠ মেয়র শাহাদাত হোসেন সেই আন্দোলনের অংশীদারত্ব দাবি করছেন।
ফলে দেয়ালের রং মুছে যাওয়ার ঘটনাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বৈধতা ও প্রতীকী কর্তৃত্বের সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
রোববার রাতেই টাইগারপাস এলাকায় এনসিপি ও বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যে উত্তেজনার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
কিন্তু সোমবার সকাল থেকে যে বাড়তি পুলিশি মোতায়েন দেখা গেছে, তাতে স্পষ্ট—প্রশাসন আশঙ্কা করছে, দেয়ালের এই সংঘাত যেকোনো সময় রাস্তায় বড় রাজনৈতিক সংঘর্ষে গড়াতে পারে।

