back to top

১০ বছরে ঋণ দ্বিগুণ, শেষে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা: আতঙ্কে নূরজাহান গ্রুপ

প্রকাশিত: ২৪ মে, ২০২৬ ১৪:৩১

ঋণের পাহাড়, আদালতের কঠোরতা: ১০৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণে নূরজাহান গ্রুপের চার কর্ণধারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

চট্টগ্রামের শিল্প ও বাণিজ্য অঙ্গনে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে বহুল আলোচিত এক ঋণখেলাপি মামলাকে ঘিরে।

প্রায় ১০৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ে রূপালী ব্যাংক পিএলসির দায়ের করা অর্থঋণ জারি মামলায় নূরজাহান গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের চার শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং পাঁচ মাসের দেওয়ানি আটকাদেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালতের এ আদেশের পর ব্যবসায়ী মহলে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আদালতের নির্দেশনা অমান্য, ঋণ পরিশোধে নিষ্ক্রিয়তা এবং ধারাবাহিক অনুপস্থিতিকে ‘গুরুতর অবমাননা’ হিসেবে বিবেচনা করে আদালত এ কঠোর অবস্থানে গেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত-১–এর বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন এ আদেশ দেন।

আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. এরশাদ বলেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে একাধিকবার নোটিশ জারি করা হলেও তারা আদালতের নির্দেশনা কার্যকর করেননি। ফলে আদালত কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছেন।

আদালতের আদেশ অনুযায়ী, যাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও পাঁচ মাসের দেওয়ানি আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে তাঁরা হলেন—মেসার্স নূরজাহান ফ্লাওয়ার মিল লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইফতেখার আল জাবের, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রহিম, মেসার্স জাসমির ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেডের চেয়ারম্যান টিপু সুলতান এবং মেসার্স নূরজাহান সুপার অয়েল লিমিটেডের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন।

তবে একই মামলায় মেসার্স মাররিন ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমদের বিরুদ্ধে এ পর্যায়ে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা আটকাদেশ জারি হয়নি।

এক দশকে ঋণ বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে রূপালী ব্যাংকের আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখা নূরজাহান ফ্লাওয়ার মিল লিমিটেডসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অর্থঋণ মামলা দায়ের করে। মামলাটি ছিল অর্থঋণ মামলা নম্বর ৩৭৩/২০১৬।

পরে চলতি অর্থঋণ জারি মামলা নম্বর ৫৪/২০২৬–এর ধারাবাহিক শুনানিতে ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই আদালত রূপালী ব্যাংকের পক্ষে ডিক্রি জারি করেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেন।

কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তরা কোনো অর্থ পরিশোধ করেননি বলে আদালতে উপস্থাপিত নথিতে উল্লেখ করা হয়।

ডিক্রি অনুযায়ী, মূল পাওনা ছিল ৫০ কোটি ৪০ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। কিন্তু ২০১৬ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ১২ শতাংশ হারে সরল সুদ যোগ হয়ে সুদের অঙ্ক দাঁড়ায় ৫৯ কোটি ২২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা।

আবগারি শুল্ক, মামলা ব্যয় এবং অন্যান্য খরচ যুক্ত হয়ে মোট দাবি গিয়ে দাঁড়ায় ১০৯ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। এর মধ্যে মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ফলে বর্তমান নিট পাওনা দাঁড়িয়েছে ১০৯ কোটি ৬৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

“১০৯ কোটি টাকা কি আমি একা খেয়েছি?”—ইফতেখার আল জাবের

মামলার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে নূরজাহান ফ্লাওয়ার মিল লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইফতেখার আল জাবের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “১০৯ কোটি টাকা কি আমি একা খেয়েছি? ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে নানা সংকট তৈরি হয়েছে।

ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ না দিয়ে সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।”

তিনি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হলেও আর্থিক সংকট, বাজার অস্থিরতা এবং সুদের চাপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য ভিন্ন। তাঁদের অভিযোগ, নোটিশ জারির পরও দায়ীরা আদালতে উপস্থিত হননি এবং পাওনা পরিশোধে কোনো বাস্তব উদ্যোগ নেননি। এতে ডিক্রি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

আদালতের কঠোর অবস্থানে ব্যবসায়ী মহলে আতঙ্ক

আইনজীবীরা বলছেন, অর্থঋণ আদালত সাধারণত শেষ পর্যায়ে গিয়ে এ ধরনের ব্যবস্থা নেয়। নোটিশ অমান্য, সম্পদ গোপনের আশঙ্কা কিংবা আদালতের প্রতি অসহযোগিতামূলক আচরণ দেখা গেলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও দেওয়ানি আটকাদেশ দেওয়া হয়।

একজন আইনজীবী বলেন, “এ ধরনের আদেশ ব্যবসায়ী সমাজের জন্য সতর্কবার্তা। আদালত এখন খেলাপি ঋণ আদায়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে।”

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী অঙ্গনে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর খেলাপি ঋণ, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এদিকে মামলাটি এখন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী আদালত কার্যক্রমের দিকে এগোচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট সবার।