back to top

এক মোটরসাইকেল, দুই স্বপ্ন, এক মর্মান্তিক পরিণতি!

কর্ণফুলীর সড়কে নিভে গেল দুটি জীবন

প্রকাশিত: ০২ জুন, ২০২৬ ১৩:৪০

ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। একটি সাধারণ দিনের মতোই শুরু হয়েছিল বিধান মল্লিকের সকাল।

মোটরসাইকেলের পেছনে বসেছিলেন তার ৭০ বছর বয়সী বাবা দুর্গাপদ মল্লিক। ছেলেটির দায়িত্ব ছিল বাবাকে আনোয়ারার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া।

এরপর দ্রুত ফিরে গিয়ে স্কুলে ক্লাস নেওয়ার কথা। শিক্ষার্থীরা হয়তো অপেক্ষায় ছিল তাদের প্রিয় বিজ্ঞান শিক্ষকের জন্য। কিন্তু ভাগ্য সেদিন অন্য গল্প লিখে রেখেছিল।

মঙ্গলবার (২ জুন) সকালে কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতুর প্রথম সিঁড়ি এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে প্রাণ হারান আনোয়ারা উপজেলার চাতরী ইউনিয়নের সিংহরা গ্রামের বাসিন্দা দুর্গাপদ মল্লিক (৭০) এবং তার ছেলে বিধান মল্লিক (৪৭)।

বিধান মল্লিক কর্ণফুলীর দৌলতপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তারা নগরের পাথরঘাটা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, সকাল আটটার দিকে নতুন সেতু এলাকা থেকে মইজ্জ্যারটেকের দিকে যাচ্ছিল একটি পিকআপ ভ্যান ও মোটরসাইকেল।

শাহ আমানত সেতুর প্রথম সিঁড়ি এলাকায় পৌঁছালে দুটি যানবাহনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান মোটরসাইকেলের পেছনে বসা দুর্গাপদ মল্লিক।

গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক বিধান মল্লিককে মৃত ঘোষণা করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী জামাল উদ্দীনের বর্ণনায় উঠে আসে ভয়াবহ সেই মুহূর্তের চিত্র। তিনি জানান, সেতু থেকে নামার পথে পিকআপটি মোটরসাইকেলকে সজোরে ধাক্কা দেয়। আঘাতের তীব্রতায় দুর্গাপদ মল্লিক পিকআপের নিচে পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

স্বজন বাবলা মল্লিকের কণ্ঠে ছিল অসহায় কান্না। তিনি জানান, বিধান মল্লিক বাবাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন। বাবাকে নামিয়ে দিয়ে তার স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই প্রাণ হারাতে হলো বাবা-ছেলেকে।

সড়ক দুর্ঘটনার খবর বাংলাদেশে নতুন নয়। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও প্রাণ ঝরে। কিন্তু কিছু ঘটনা কেবল পরিসংখ্যান হয়ে থাকে না; সেগুলো মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে।

এই ঘটনাও তেমনই একটি ট্র্যাজেডি। একজন বৃদ্ধ বাবা, যার জীবনের শেষভাগে সন্তানের সঙ্গই ছিল সবচেয়ে বড় ভরসা। আর একজন শিক্ষক, যিনি সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করছিলেন।

কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একই পরিবারের দুই সদস্যের মৃত্যু শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে।

বিধান মল্লিক শুধু একজন পুত্র ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন শিক্ষকও। প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থীর কাছে তিনি ছিলেন জ্ঞানের আলো ছড়ানোর মানুষ। তার আকস্মিক মৃত্যু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সহকর্মী এবং শিক্ষার্থীদের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি।

একজন শিক্ষকের মৃত্যু মানে কেবল একটি প্রাণহানি নয়; তার সঙ্গে হারিয়ে যায় বহু শিক্ষার্থীর স্মৃতি, প্রেরণা ও ভবিষ্যৎ গঠনের একজন কারিগর।

কর্ণফুলীর এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্ন। সেতু এলাকা, ঢালু রাস্তা এবং দ্রুতগতির যানবাহনের কারণে এমন দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায় নির্ধারণে তদন্তের দাবি উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে গতিনিয়ন্ত্রণ, কঠোর নজরদারি, চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমানো কঠিন।

দুর্গাপদ মল্লিক হয়তো ভেবেছিলেন, ছেলের মোটরসাইকেলে চড়ে নিরাপদেই বাড়ি পৌঁছে যাবেন। বিধান মল্লিক হয়তো ভাবছিলেন, বাবাকে নামিয়ে দিয়ে যথাসময়ে স্কুলে পৌঁছে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেবেন।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের একটি দুর্ঘটনা সব পরিকল্পনা, সব দায়িত্ব, সব স্বপ্নকে থামিয়ে দিল।

একটি মোটরসাইকেলে শুরু হয়েছিল বাবা-ছেলের সকালের যাত্রা। সেই যাত্রার শেষ গন্তব্য হলো হাসপাতালের মর্গ।

আর পেছনে রেখে গেল স্বজনদের অশ্রু, শিক্ষার্থীদের শোক এবং একটি প্রশ্ন—আর কত প্রাণ হারালে আমাদের সড়কগুলো সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হবে?