back to top

পৌনে চার কোটি টাকার ওষুধ, তারপরও মশা দেখতে আমেরিকা! প্রশ্নের মুখে চসিক

প্রকাশিত: ০২ জুন, ২০২৬ ১২:৪০

চট্টগ্রামে বর্ষা এলেই মশার উপদ্রব নিয়ে নাগরিকদের অভিযোগ বাড়তে থাকে। ড্রেন, খাল, জলাবদ্ধতা আর অরক্ষিত ডোবা ঘিরে প্রতিদিনই নগরবাসীর ভোগান্তির গল্প জমা হয়।

ঠিক এমন এক সময়ে মশকনিধনের উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিদর্শনের নামে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যেতে চেয়েছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ পাঁচ কর্মকর্তা।

কিন্তু সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত থেমে গেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দরজায়।

শুধু অনুমোদন না দেওয়াই নয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি মন্তব্য এখন প্রশাসনিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে, মশকনিধনের উদ্ভাবনী কার্যক্রম দেখতে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসির অর্থায়নে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা সফরের একটি প্রস্তাব স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল।

সেই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন, “মশকনিধন শেখা বা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার দরকার নেই।

দেশেই সন্ধ্যার পর যেকোনো ডোবার পাশে দু–তিন ঘণ্টা অবস্থান করলেই মশকনিধনের অনেক উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব হবে।”

সরকারপ্রধানের এই মন্তব্য কেবল একটি সফর বাতিলের ঘটনা নয়; বরং এটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং বিদেশভিত্তিক সমাধানের প্রতি নির্ভরতার প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, প্রতিনিধিদলের পরিকল্পনায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ও ফ্লোরিডা রাজ্যে একটি কারখানা এবং একটি ল্যাব পরিদর্শন।

এই দলে থাকার কথা ছিল মেয়র শাহাদাত হোসেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির চৌধুরী এবং ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম। তাঁদের সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তাকে যুক্ত করারও প্রস্তাব ছিল।

তবে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ। তিনি জানান, বিদেশ সফরের অনুমতি মেলেনি।

ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে মশা নিধনের জন্য প্রায় পৌনে চার কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক প্রযুক্তির কীটনাশক বিটিআই (বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস) ক্রয় করেছে এবং বর্তমানে তা ব্যবহারও করছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, যখন আধুনিক প্রযুক্তির ওষুধ মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ হচ্ছে, তখন একই সময়ে বিদেশে গিয়ে উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তা কতটা ছিল?

বিশ্লেষকদের মতে, নগর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ও জ্ঞান আহরণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়ন। মশা উৎপাদনের উৎস যদি নগরের খাল, ড্রেন, জলাবদ্ধ এলাকা ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যেই থেকে যায়, তাহলে বিদেশের ল্যাবরেটরি ঘুরে আসা সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না।

প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যে সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা গেছে বলে মনে করছেন অনেকে। তাঁর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত বার্তা হলো—সমস্যা যেখানে, সমাধানের অনুসন্ধানও সেখানেই শুরু হওয়া উচিত।

ফ্লোরিডার সফর আপাতত বাতিল হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—মশার বিরুদ্ধে লড়াই কি বিদেশি অভিজ্ঞতার অভাবে থমকে আছে, নাকি মাঠপর্যায়ের কার্যকর ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতেই নাগরিকরা এখনো মশার কাছে জিম্মি?

চট্টগ্রামের নাগরিকদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটি—বিদেশ সফর নয়, মশা কমেছে কি না।

কারণ শেষ পর্যন্ত নাগরিকের কাছে সাফল্যের মাপকাঠি কোনো ল্যাব পরিদর্শন নয়; বরং সন্ধ্যার পর নিজের ঘরে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারা।