back to top

নিখোঁজের মামলা থেকে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন: দুই বছরের অনুসন্ধানে পিবিআইয়ের সাফল্য

প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০২৬ ০৭:২১

বেওয়ারিশ কবরের নিচে লুকিয়ে ছিল এক বাবার পরিচয়, দুই বছর পর বেরিয়ে এলো পরিবারের ভেতরের অন্ধকার অধ্যায়

চট্টগ্রামের আলোচিত মীর মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একের পর এক হৃদয়বিদারক তথ্য।

যে মানুষটিকে দুই বছর আগে সড়কের পাশ থেকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে উদ্ধার করা হয়েছিল, যাঁকে শেষ পর্যন্ত বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়, তিনি যে একজন বাবা—এবং তাঁর মৃত্যুর অভিযোগের তীর যে তাঁরই বড় ছেলে বেলাল হোসেনের দিকে যাবে—তা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

মীর মুজিবুর রহমান ছিলেন পেশায় একজন বাবুর্চি। জীবনসংগ্রামে বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি পরিবার চালিয়েছেন। চারটি বিয়ে করেছিলেন তিনি।

দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নিজের অধিকাংশ জমি বিক্রি করে দেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর হাতে অবশিষ্ট ছিল শুধু বসতভিটা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, এই অবশিষ্ট ভিটেমাটি বিক্রির উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বড় ছেলে বেলাল হোসেন নিশ্চিত হন যে বাবা শেষ সম্পত্তিটুকুও বিক্রি করতে চান। এরপর শুরু হয় এক সুপরিকল্পিত ছক।

তদন্তে উঠে এসেছে, একজন নারীকে ব্যবহার করে মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়।

ফোনালাপের মাধ্যমে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করা হয়। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই ২০২৪ সালের ৭ জুন চট্টগ্রামে আসেন তিনি।

অভিযোগ অনুযায়ী, বাকলিয়ার একটি বাসায় তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে তাঁকে অচেতন করা হয়।

এরপর বিভিন্ন ধাপে তাঁকে স্থানান্তর করে হালিশহর আউটার রিংরোড এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানেই তাঁর মৃত্যু ঘটে।

পরদিন উদ্ধার হওয়া লাশটির পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। স্বজনেরা তখনও জানতেন না, তাঁদের প্রিয় মানুষটি আর বেঁচে নেই। ফলে আনুষ্ঠানিক পরিচয়হীন অবস্থায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

ঘটনার আরেকটি বেদনাদায়ক দিক হলো, পরিবারের ভেতর থেকেই নিখোঁজের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছিল।

মুজিবুর রহমানের মেয়ে সালমা বেগম ভাইয়ের বিরুদ্ধেই অপহরণের অভিযোগ এনে মামলা করেছিলেন। সেই অভিযোগের সূত্র ধরে তদন্তের পরিধি বাড়তে থাকে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর পিবিআই ঘটনার জট খুলতে সক্ষম হয়।

তদন্তকারীরা বলছেন, এই মামলাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধান নয়; এটি পারিবারিক সম্পর্ক, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের সংকট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এনেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ নতুন নয়। তবে যখন সেই বিরোধ পারিবারিক আস্থাকে ধ্বংস করে অপরাধে রূপ নেয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজের নৈতিক ভিত্তি। কারণ একটি পরিবারের ভাঙন শুধু কয়েকজন মানুষের নয়, সামাজিক মূল্যবোধেরও পরাজয়।

এদিকে আদালতে দেওয়া জবানবন্দি এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে তদন্তকারীরা ঘটনাটিতে জড়িত বলে সন্দেহভাজন নারীকে খুঁজছেন।

অন্যদিকে সালমা বেগমের কণ্ঠে এখনো ঘুরে ফিরে আসে একটাই প্রশ্ন—যে বাবা জীবনের সঞ্চয়, শ্রম আর ভালোবাসা দিয়ে সন্তানদের বড় করেছিলেন, তাঁর শেষ পরিণতি কেন এমন হলো?

দুই বছর আগে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে দাফন হওয়া মীর মুজিবুর রহমানের কবর আজ শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি বহন করছে না; সেটি হয়ে উঠেছে পরিবার, বিশ্বাস, লোভ এবং মানবিকতার এক গভীর ও বেদনাদায়ক প্রতীক।

তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু রেখে গেছে এমন এক প্রশ্ন, যার উত্তর খুঁজতে সমাজকে হয়তো আরও অনেক দিন ভাবতে হবে।