back to top

মুসলেরার ভুলে উরুগুয়ের বিদায়,নকআউটে স্পেন

প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬ ০৭:৩২

ফুটবল সব সময় সৌন্দর্যের খেলা নয়। কখনো কখনো নিখুঁত পাস, দৃষ্টিনন্দন ড্রিবল কিংবা কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বকে ছাপিয়ে যায় স্নায়ুর লড়াই, শারীরিক দ্বৈরথ আর টিকে থাকার অদম্য সংগ্রাম।

২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এইচ’-এর শেষ ম্যাচে গুয়াদালাহারা স্টেডিয়ামে দেখা গেল ঠিক এমনই এক লড়াই।

মার্সেলো বিয়েলসার উরুগুয়ের সামনে ছিল বাঁচা-মরার সমীকরণ। অন্যদিকে লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেনের লক্ষ্য ছিল গ্রুপসেরা হয়ে নকআউট পর্বে যাওয়া।

শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরার একটি অপ্রত্যাশিত ভুলই দুই দলের ভাগ্য আলাদা করে দেয়। আলেক্স বায়েনার একমাত্র গোলে ১–০ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় স্পেন।

এই পরাজয়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় উরুগুয়ের বিশ্বকাপ অভিযান। টানা দ্বিতীয়বারের মতো গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।

আর স্পেন ধরে রাখে টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা, নিশ্চিত করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়নের মর্যাদা।

ম্যাচের শুরু থেকেই স্পেনের সবচেয়ে বড় আক্রমণভাগের অস্ত্র লামিন ইয়ামালকে থামাতে মরিয়া ছিল উরুগুয়ে।

বিয়েলসার শিষ্যরা আক্রমণাত্মক মনোভাবের পাশাপাশি শারীরিক ফুটবলেই বেশি জোর দেয়। ফলে প্রথমার্ধে খেলার চেয়ে দ্বৈরথই যেন বেশি চোখে পড়ে।

স্পেনের উনাই সিমন ও আলেক্স বায়েনার কিছু ভুল থেকে সুযোগ পেয়েছিল উরুগুয়ে।

কিন্তু গোলের সামনে ডারউইন নুনেজের ব্যাকহিল করার অপ্রয়োজনীয় চেষ্টায় নষ্ট হয় সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মুহূর্তগুলোর একটি। সেই ব্যর্থতার মূল্যই পরে আরও বড় হয়ে ধরা দেয়।

ম্যাচের ৪২ মিনিটে আসে সন্ধ্যার সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত। উরুগুয়ের মিডফিল্ডার ম্যানুয়েল উগার্তে চোট পেয়ে মাঠে পড়ে ছিলেন।

স্প্যানিশরা খেলা থামানোর বদলে আক্রমণ চালিয়ে যায়। একই সময় ইয়ামালও ফাউলের শিকার হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

এই পরিস্থিতিতেই বল পেয়ে যান আলেক্স বায়েনা। বক্সের মাথা থেকে নেওয়া তাঁর শটটি প্রথমে খুব একটা বিপজ্জনক মনে হয়নি।

কিন্তু ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরা অবিশ্বাস্যভাবে বলটি হাত থেকে ফসকে ফেলেন। মুহূর্তেই বল জালে জড়িয়ে যায়।

একটি ভুল, একটি গোল—আর তাতেই ম্যাচের গতিপথ বদলে যায়।

বিরতির পর গোল শোধে ঝাঁপিয়ে পড়ে উরুগুয়ে। কিন্তু আক্রমণে প্রয়োজনীয় ধার কিংবা পরিকল্পনা কোনোটাই দেখা যায়নি। ম্যাচের ৮০ মিনিটের আগে পর্যন্ত স্পেনের গোলবার লক্ষ্য করে একটি শটও নিতে পারেনি তারা।

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ৬০ মিনিটে। দলের সবচেয়ে বড় তারকা ফেদেরিকো ভালভার্দেকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি নিজেই। কোচ মার্সেলো বিয়েলসার সিদ্ধান্ত তখন প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এদিকে সুযোগ পেলে ব্যবধান বাড়ানোর চেষ্টাও করেছে স্পেন। ম্যাচের শেষ দিকে ফেরান তোরেসের এক শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে দ্বিতীয় গোলের অপেক্ষা দীর্ঘই থেকে যায়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে উরুগুয়ের হতাশা। অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের পাউ কুবার্সির ওপর ভয়াবহ ফাউল করেন অগাস্টিন কানোবিও। সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে দ্বিধা করেননি রেফারি।

এরপরই দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মাঠের পাশে হাতাহাতি ও বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটে, যা উরুগুয়ের হতাশারই প্রতিফলন হয়ে ওঠে।

ম্যাচ শেষে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে সন্তুষ্ট নিজের দলের মানসিক দৃঢ়তায়।

“আজকের ম্যাচটি আমাদের ধৈর্যের বড় পরীক্ষা ছিল। ছেলেরা এমন একটি শারীরিক শক্তির ম্যাচেও মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছে।”

তবে জয় পেলেও স্পেনের জন্য দুঃসংবাদ আছে। গুরুতর চোটের কারণে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছেন ইয়েরেমি পিনো।

অন্যদিকে বিদায়ের সব দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন মার্সেলো বিয়েলসা।

“এই দলটার যে সম্ভাবনা ছিল, তাকে আমি একটি যোগ্য দল হিসেবে মাঠে দাঁড় করাতে পারিনি। এই ব্যর্থতার পুরো দায় আমার।”

গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা ধরে রাখা স্পেন এখন আত্মবিশ্বাসী। টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকা দলটি শেষ ষোলোতে লস অ্যাঞ্জেলেসে মুখোমুখি হবে আলজেরিয়া অথবা অস্ট্রিয়ার।

অন্যদিকে উরুগুয়ের জন্য শুরু হলো নতুন আত্মসমালোচনার অধ্যায়। যে দলটি বিশ্বকাপ শুরুর আগে সম্ভাব্য শিরোপাপ্রত্যাশীদের আলোচনায় ছিল, তাদের যাত্রা থেমে গেল গ্রুপ পর্বেই।

আর সেই বিদায়ের প্রতীক হয়ে রইল ফার্নান্দো মুসলেরার হাত ফসকে যাওয়া একটি বল।