চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার নলুয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা তখন বন্যার পানিতে ডুবে। ঘরবন্দী মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ব্যস্ত। চারদিকে শুধু পানি আর উৎকণ্ঠা।
এমন এক দুর্যোগের রাতেই পূর্ব গাটিয়াডেঙ্গা গ্রামের মোসলেম মুন্সি বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানের দেয়াল ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দাবি, এটি কেবল ভাঙচুর নয়,একটি পরিবারকে ভয় দেখানো এবং দীর্ঘদিনের বিরোধকে নতুন করে উসকে দেওয়ার চেষ্টা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দিবাগত রাতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় এলাকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য মিজানুল ইসলাম জানান, বিষয়টি মৌখিকভাবে সাতকানিয়া থানাকে অবহিত করা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হবে।
মিজানুল ইসলামের ভাষ্য, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পুরো এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়েছিল। মানুষ যখন জীবন ও সম্পদ রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন রাতের অন্ধকারে দুর্বৃত্তরা তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানের দেয়াল ভেঙে দেয়।
তাঁর অভিযোগ, নলুয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ফখরুদ্দিন মিন্টুর অনুসারী একটি গ্রুপ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
তবে অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকার একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্র এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে আসছে।
প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, ছিনতাই, মাদক বেচাকেনা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো কর্মকাণ্ডে তারা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ফখরুদ্দিন মিন্টু বিদেশে অবস্থান করলেও তাঁর বড় ভাই কামাল উদ্দিন এলাকায় গ্রুপটির কার্যক্রম তদারকি করেন। আর ভাগিনা মোরশেদ আলম মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দেন।
তাঁদের আরও অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকা মোরশেদ আলম রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামায়াতপন্থী শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এলাকায় নিজের প্রভাব ধরে রেখেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে জুলাই-পরবর্তী ঘটনাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এলাকাবাসীর দাবি, মিন্টু ও কামাল উদ্দিনের প্রভাবের কারণে প্রকাশ্যে তাঁদের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পান অনেকেই।
অভিযোগ করলে নানাভাবে হয়রানি, ভয়ভীতি এবং প্রতিশোধের আশঙ্কা থাকে বলেও তাঁরা জানান।
মিজানুল ইসলামের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের হামলা ও হুমকির শিকার হয়ে আসছেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৭ জুন সাতকানিয়া থানায় ১৩০২ নম্বর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি।
এরপর ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট বাবার কবর জিয়ারত করতে গেলে মোরশেদ আলম তাঁর ওপর ধারালো দা দিয়ে হামলা করেন বলে অভিযোগ করেন মিজানুল।
এতে তাঁর বাম হাত গুরুতর জখম হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি দা উদ্ধার করে বলেও তাঁর দাবি।
এ ছাড়া চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি রাতে তাঁর বাড়ির চারটি সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ঘটনায় ৩০ জানুয়ারি সাতকানিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল।
মিজানুল ইসলামের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৮ মে ঈদের নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে অস্ত্র তাক করা হয়। তাঁর চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা দ্রুত সরে যায়।
তিনি দাবি করেন, ওই ঘটনায় মোরশেদ আলমের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র এবং তাঁর সহযোগী শহিদের হাতে ধারালো কিরিচ ছিল। পরে বিষয়টি থানায় লিখিতভাবে জানানো হয়, যার এসডিআর নম্বর ১৪৫৫।
এ বিষয়ে সাতকানিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, কবরস্থানের দেয়াল ভাঙচুরের অভিযোগ তাঁকে জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতির কারণে পুলিশের স্বাভাবিক কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই প্রতিবেদনে বর্ণিত হামলা, ভাঙচুর, অস্ত্র প্রদর্শন, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও অন্যান্য অভিযোগ মূলত অভিযোগকারী ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার বক্তব্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁদের প্রতিক্রিয়া যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

