চাপাতির কোপে রক্তাক্ত শরীর নিয়েও কয়েক কিলোমিটার ট্রাক চালিয়েছিলেন মো. জামাল উদ্দিন (৫৬)। হয়তো তখনও তাঁর একটাই চিন্তা ছিল-চলন্ত ট্রাকটি যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আরেকটি প্রাণহানির কারণ না হয়।
শেষ পর্যন্ত যখন আর শক্তি রইল না, তখন স্টিয়ারিং তুলে দিলেন হেলপার মো. বিল্লাল (২৩) এর হাতে। কিছুক্ষণ পর, চট্টগ্রামের পথে ছুটে চলা সেই ট্রাকের কেবিনেই নিভে গেল তাঁর জীবন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ভোররাতে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সদর উপজেলার উজানিশার ব্রিজ এলাকায় ঘটে এই মর্মান্তিক ঘটনা।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রামগামী একটি পণ্যবাহী ট্রাক উজানিশার ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে ৫-৬ জনের একটি অজ্ঞাত ডাকাত দল চলন্ত ট্রাকটির ডান পাশের কাচ ভেঙে কেবিনে ঢুকে পড়ে।
এরপর তারা চালক মো. জামাল উদ্দিনকে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে।
গুরুতর আহত অবস্থাতেও জামাল উদ্দিন কিছু দূর ট্রাকটি চালিয়ে নেন। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনি স্টিয়ারিং তুলে দেন হেলপার মো. বিল্লাল (২৩)-এর হাতে।
এরপর বিল্লাল ট্রাকটি চালিয়ে চট্টগ্রামের দিকে রওনা দেন। কিন্তু ফেনীর মহিপাল এলাকায় পৌঁছানোর আগেই গুরুতর আহত জামাল উদ্দিন ট্রাকের ভেতরেই মারা যান।
তবুও বিল্লাল ট্রাকটি নিরাপদে চালিয়ে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানাধীন নাহার এগ্রো ফিড লিমিটেডের বিপরীতে ফারদিন পেট্রোল পাম্পের সামনে নিয়ে যান। সেখানে পৌঁছে তিনি সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষকে পুরো বিষয়টি জানান।
খবর পেয়ে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হেলপারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাঁর বর্ণনায় উঠে আসে চলন্ত ট্রাকে ডাকাত দলের হামলার পুরো ঘটনা।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত চালক মো. জামাল উদ্দিনের বাড়ি ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার উত্তর চর আইসা এলাকায়। তাঁর মরদেহের সুরতহালসহ প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম চলছে।
একই সঙ্গে ঘটনাটি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সদর থানাকে অবহিত করা হয়েছে এবং নিহতের পরিবারকেও খবর দেওয়া হয়েছে।
জোরারগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবদুল হালিম বলেন, হেলপার বিল্লাল হোসেনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত করছে।
নিহত জামাল উদ্দিনের পরিবারকে অবহিত করা হয়েছে। পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
এই ঘটনা আবারও মহাসড়কে পণ্যবাহী যানবাহনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। চলন্ত ট্রাকের কাচ ভেঙে সংঘবদ্ধ হামলা চালানো কতটা সহজ হয়ে উঠেছে, ডাকাতরা কীভাবে এমন অভিযান চালিয়ে পালিয়ে যেতে পারছে, এবং মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি কতটা কার্যকর-এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তেই মিলতে হবে।
একজন চালকের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের উপার্জনের পথ বন্ধ করে দেয় না, এটি মহাসড়কের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও কঠিন প্রশ্ন তোলে।
তাই ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, এবং ঝুঁকিপূর্ণ মহাসড়ক এলাকায় কার্যকর নিরাপত্তা জোরদারের দাবি স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে।
