back to top

চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কে অনিয়ম, আলোচনায় পিন্টু–হানিফ সিন্ডিকেট

টেন্ডার থেকে বিল পরিশোধ—প্রতিটি ধাপে অনিয়মের অভিযোগ

প্রকাশিত: ২১ মে, ২০২৬ ১৩:২০

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়।

গত বছরের ৯ অক্টোবর প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সওজের অধীনে বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পে নির্মাণকাজে সর্বনিম্ন ২৯ হাজার ২৩০ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে।

একই প্রতিবেদনে উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণকাজে সার্বিক দুর্নীতির হার ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়।

এমন বাস্তবতার মধ্যেই চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপদ বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের কাজের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু হানিফের তদারকিতে চলমান বিভিন্ন প্রকল্পে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, কমিশন বাণিজ্য, বিল জালিয়াতি ও ঠিকাদার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দক্ষিণ চট্টগ্রামে সড়ক উন্নয়নের নামে দায়সারা কাজ করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রকল্পে মাটিযুক্ত নিম্নমানের বালি, অপর্যাপ্ত নির্মাণসামগ্রী এবং মানহীন উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে সড়কের স্থায়িত্ব ও জননিরাপত্তা নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর শঙ্কা।

তাদের ভাষ্য, যথাযথ তদারকি না থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ কমাতে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করছে।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের একাংশ কমিশনের বিনিময়ে এসব অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়ায় ঠিকাদাররা দায়সারা কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে।

স্থানীয়দের মতে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক শুধু একটি আঞ্চলিক সড়ক নয়; এটি দেশের পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যম।

প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন এ মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করে। অথচ এমন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের উন্নয়নকাজেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে।

সওজ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের বিভিন্ন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, কার্যাদেশ প্রদানে স্বজনপ্রীতি, কাজের তদারকিতে গাফিলতি, বিল পরিশোধে দুর্নীতি এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে গোপনে প্রাক্কলন তৈরি ও বিশেষ শর্ত সংযোজনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সংঘবদ্ধ ঠিকাদার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগি করে কমিশন নেওয়া হচ্ছে। সড়ক নির্মাণে প্রয়োজনের তুলনায় কম রড, সিমেন্ট, বিটুমিন ও খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে।

এমনকি নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারে মৌখিক বা লিখিত অনুমতি দিয়ে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া আংশিক কাজ শেষ করে ভুয়া মাস্টার রোল ও বিল দাখিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে কাজ শেষ না হলেও ঠিকাদারদের পূর্ণ বিল ছাড় করে দেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ আছে, সওজের কিছু কর্মকর্তা রাস্তা পরিদর্শন কিংবা ত্রুটি যাচাই ছাড়াই বিল অনুমোদন করছেন।

এমনকি কাজ শেষ হওয়ার পর ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ডের (ডিএলপি) মধ্যে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ঠিকাদারদের দায়মুক্তি দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

‘মৃত্যুকূপ’ জাঙ্গালিয়ায়ও অনিয়মের অভিযোগ

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের অন্যতম দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা লোহাগাড়ার চুনতি জাঙ্গালিয়া অংশ। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মৃত্যুকূপ’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিনের দুর্ঘটনা ও যানজট নিরসনে সম্প্রতি সরকার ওই এলাকায় প্রায় ৯০০ মিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু করে।

কিন্তু কাজ শুরু হওয়ার পরপরই সেখানে নিম্নমানের মাটিযুক্ত বালি ও অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, মানহীন নির্মাণকাজের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

লোহাগাড়ার প্যাকেজ-৩-এর আওতাধীন এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এম এ এইচ কনস্ট্রাকশন। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চার লেন নির্মাণকাজ শুরু হলেও সড়কের মাঝখানে এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে অন্তত ১০টি বিদ্যুতের খুঁটি। রয়েছে সওজের বড় বড় বিলবোর্ডও। এতে চলাচলকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।মহাসড়ক

চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ জানিয়েছে, বিদ্যুতের খুঁটি সরাতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করায় এখনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। ফলে খুঁটি অপসারণের কাজও ঝুলে আছে।

সওজ সূত্র জানায়, চুনতির মিঠার দোকান এলাকা থেকে জাঙ্গালিয়া পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার অংশে সড়ক প্রশস্তকরণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে দুর্ঘটনাপ্রবণ জাঙ্গালিয়া এলাকায় প্রায় ৯০০ মিটার অংশ ডিভাইডারসহ চার লেনে উন্নীত করা হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, খানদিঘী এলাকাসহ একাধিক স্থানে ভরাটকাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাটিযুক্ত ও নিম্নমানের বালি ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও শুকনো বালির পরিবর্তে ভেজা বালি দিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, প্রায় প্রতিদিনই এ সড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটছে। কিছুদিন আগেও একই পরিবারের পাঁচ সদস্য নিহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ শুরু করলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জনমনে ক্ষোভ তৈরি করেছে।

তাদের দাবি, নিম্নমানের কাজ হলে মানুষের জীবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং মানসম্মত উপকরণ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

তিন প্যাকেজে প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাজ

সওজ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া অংশে তিনটি প্যাকেজে উন্নয়নকাজ চলছে।

সাতকানিয়া রাস্তার মাথা থেকে লোহাগাড়ার রাজঘাটা পর্যন্ত ৮ দশমিক ৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা।

রাজঘাটা থেকে চুনতি মিঠার দোকান পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার অংশে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ কোটি টাকা। মিঠার দোকান থেকে জাঙ্গালিয়া পর্যন্ত চার লেন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।

এই তিনটি প্যাকেজের কাজ বাস্তবায়ন করছে এম এ এইচ কনস্ট্রাকশন ও এম এ কনস্ট্রাকশন নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ১০০ কোটি টাকার এসব প্রকল্পে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের একটি অংশের মধ্যে কমিশনভিত্তিক অনিয়ম চলছে।

বাড়ছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে উদ্বেগ

স্থানীয়দের ভাষ্য, ‘মৃত্যুকূপ’ নামে পরিচিত জাঙ্গালিয়া এলাকায় গত এক বছরে ছোট-বড় প্রায় অর্ধশত দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ৭৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন আরও অনেকে।

চলতি মাসের ৯ মে মারসা পরিবহনের দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। আহত হন অন্তত ১৫ জন।

এ অবস্থায় স্থানীয়দের প্রশ্ন—যে সড়কে প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ, সেই সড়কের উন্নয়নকাজেও যদি অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার হয়, তবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু হানিফের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।