ডিসি হওয়ার ‘ঘুষচুক্তি’ ও রাজস্বের ‘রাজত্ব ’: চসিকের বিতর্কিত কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬ ০৩:২৪

নিজস্ব প্রতিবেদক | 

প্রশাসন ক্যাডারের একজন উপসচিব। কর্মস্থল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। কিন্তু অভিযোগের ফিরিস্তি যেন কোনো মাফিয়া ডনের চেয়ে কম নয়। মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ডিসি হওয়ার উচ্চাভিলাষ, সংবাদকর্মীকে আটকে রেখে হেনস্তা এবং রাজস্ব বিভাগকে ব্যক্তিগত চাঁদাবাজির অভয়ারণ্যে পরিণত করার অভিযোগ উঠেছে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস. এম. সরওয়ার কামালের বিরুদ্ধে। এমন গুরুতর অভিযোগের পরও রহস্যজনকভাবে বহাল তবিয়তে রয়েছেন এই কর্মকর্তা।

ডিসি হওয়ার ‘৮ কোটির’ স্বপ্নজাল

অভিযোগ রয়েছে, এস. এম. সরওয়ার কামাল বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৭তম ব্যাচের একজন উপসচিব। কুমিল্লায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে পদায়ন পাওয়ার জন্য তিনি বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরে একটি চুক্তি ও অঙ্গীকারনামা দাখিল করেছিলেন বলে বিভিন্ন মহলে জোর আলোচনা রয়েছে। এই ‘পদায়ন বাণিজ্য’ নিয়ে গত ১৩ মে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছিল। অথচ, দুই মাস পেরিয়ে গেলেও সেই শোকজের জবাব এবং এর পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে রহস্যের কুয়াশা কাটেনি। অভিযোগ আছে, মন্ত্রণালয়ে প্রভাব খাটিয়ে ও মোটা অংকের ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি নিজেকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করছেন।

সাংবাদিক লাঞ্ছনা: ‘ক্ষমতার দাপট’

কেবল নিয়োগ বাণিজ্যই নয়, সরওয়ার কামালের বিরুদ্ধে পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের হেনস্তার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। গত ৭ মে ‘বাংলাধারা’র এক সাংবাদিক যখন চসিকের রাজস্ব বিভাগের অনিয়ম নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন, তখন তাকে দপ্তরে আটকে রেখে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। ওই সাংবাদিকের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ব্যক্তিগত গ্যালারি ও চ্যাট তল্লাশি এবং ‘চাঁদাবাজ’ আখ্যা দিয়ে মিথ্যা মামলার হুমকি দেওয়ার ঘটনাটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এক নগ্ন আঘাত হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।

রাজস্ব বিভাগ নাকি ‘চাঁদাবাজির আখড়া’?

তদন্তকারী বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, চসিকের রাজস্ব বিভাগ এখন কেবল কর আদায়ের জায়গা নয়, বরং একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের চারণভূমি। সরওয়ার কামালের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় রয়েছে:

  • পদোন্নতি বাণিজ্য: স্কেল প্রদান ও পদোন্নতির নাম করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া।

  • মিটিং ও পিকনিকের নামে চাঁদা: প্রতি মাসে মিটিং এবং পিকনিকের নাম করে কর্মচারীদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক চাঁদা আদায়।

  • দালাল সিন্ডিকেট: রাজস্ব সার্কেলে দালাল নিয়োগ করে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে কৌশলে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।

প্রশাসনের নীরবতা ও জনমনে প্রশ্ন

সরকার যখন প্রশাসনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলছে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের তালিকা করে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঙ্কার দিচ্ছে, তখন একজন উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও নীরবতা জনমনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, তদন্তের নামে যদি দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করা হয় বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়, তবে তা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর মানুষের আস্থাকে ধূলিসাৎ করবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সক্রিয়তা কাম্য

বিভাগীয় তদন্তের নামে দায়সারা গোছের ব্যবস্থা না নিয়ে বিষয়টিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্ত করার দাবি উঠেছে। আট কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের এই উৎস এবং এর পেছনে কারা জড়িত, তা উন্মোচন করা জরুরি।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমে এস. এম. সরওয়ার কামাল সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, এগুলো ‘ষড়যন্ত্র’ এবং তার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। তবে তার এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে এই ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রত্যাশা এখন চট্টগ্রামবাসীর।

সম্পাদকীয় নোট: এই প্রতিবেদনটি জনস্বার্থ ও প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করা হবে।