পানির নিচে রেলপথ, ওপরে অনিয়মের অভিযোগ: নকশা, ড্রেনেজ ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

রেললাইন নির্মাণে ত্রুটি, নাকি প্রকল্পে অনিয়ম?

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬ ১১:০৮

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে মাত্র কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি যেন একটি রেললাইনকে নয়, বরং একসঙ্গে সামনে এনেছে অবকাঠামো নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দীর্ঘদিনের অনিয়মের নানা প্রশ্ন।

জানালীহাট ও ষোলশহর স্টেশনের মধ্যবর্তী রেলপথের একটি অংশ দুই ফুটের বেশি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর পাঁচ দিন বন্ধ ছিল ট্রেন চলাচল। আটকা পড়ে দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন।

ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো যাত্রী। আর শুধু বাতিল হওয়া টিকিটের মূল্য বাবদ যাত্রীদের ফেরত দিতে হয় ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৪ টাকা।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, এই বিপর্যয় কি কেবল অতিবৃষ্টির স্বাভাবিক ফল? নাকি রেলপথ নির্মাণের নকশা, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ও প্রকল্প তদারকিতে থাকা ত্রুটিগুলো পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে?

পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি রেললাইন যখন উঁচু বাঁধের মতো করে নির্মিত হয়, তখন তার দুই পাশের পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পর্যাপ্ত কালভার্ট, সেতু ও নিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকলে অতিবৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত সরে যেতে পারে না। তখন রেলপথ নিজেই পানি আটকে রাখার এক ধরনের প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হতে পারে।

জানালীহাট ও ষোলশহরের মধ্যবর্তী এলাকায় সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতার ঘটনায় সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ জুলাই থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

ওই সময় জানালীহাট ও ষোলশহর স্টেশনের মধ্যবর্তী রেললাইনে দুই ফুটের বেশি পানি জমে যায়। চলন্ত অবস্থায় আটকা পড়ে দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন।

পরিস্থিতি বিবেচনায় পরে যাত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজারের রেল যোগাযোগ।

চট্টগ্রামের রেলস্টেশন মাস্টার আবু জাফর মজুমদার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সাধারণত রেললাইনের ওপর চার ইঞ্চি পর্যন্ত পানি উঠলে ট্রেন চলাচল চালু রাখা হয়। কিন্তু এবার রেলট্র্যাক অন্তত দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়।

প্রায় তিন দিন রেললাইন পানির নিচে থাকায় পানি নেমে যাওয়ার পরও ট্র্যাক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে সময় লাগে। পরে ১২ জুলাই সীমিত গতিতে বা ‘অ্যাডভান্সড পাইলটিং’-এর মাধ্যমে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হয়।

রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দ্রুত যোগাযোগ স্বাভাবিক করার নির্দেশ দেন। এরপরই ১২ জুলাই থেকে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। কিন্তু ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হলেও প্রশ্নগুলো থামেনি।

পাঁচ ফুট উঁচু করার নির্দেশ, তাহলে নির্মাণে ভুল কোথায়?

ঘটনার পর রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানালীহাট ও ষোলশহর স্টেশনের মধ্যবর্তী রেললাইনের ক্ষতিগ্রস্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ অংশ পাঁচ ফুট উঁচু করে পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই নির্দেশই এখন বড় একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে-যে অংশকে পাঁচ ফুট উঁচু করার প্রয়োজন দেখা দিল, সেটি কি বর্তমান উচ্চতায় নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল ও স্থানীয় জলপ্রবাহের বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল?

অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, রেলপথ নির্মাণের সময় শুধু ট্রেন চলাচলের উপযোগী উচ্চতা নির্ধারণ করলেই হয় না।

একই সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয় এলাকার জলপ্রবাহ, জলাধার, খাল, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক এবং অতিবৃষ্টির সম্ভাব্য পরিস্থিতি।

এসব বিষয় উপেক্ষিত হলে একটি উন্নয়ন প্রকল্প পরবর্তী সময়ে জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এখানেই সামনে আসে রেললাইন নির্মাণের নকশা ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন।

পরিবেশবিদদের একটি অংশের অভিযোগ, রেললাইন নির্মাণের সময় প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ পর্যাপ্তভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

কোথাও পর্যাপ্ত কালভার্ট বা সেতু না থাকায় পানি স্বাভাবিক গতিতে এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে পারেনি। আবার কোথাও রেলপথ উঁচু বাঁধের মতো অবস্থান নেওয়ায় পানি আটকে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাল ও জলাধার ভরাট বা সংকুচিত করার অভিযোগ। ফলে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নিষ্কাশিত না হয়ে নিম্নাঞ্চলে জমে গেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি নিছক একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা নয়। বরং উন্নয়ন প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নতুন করে যাচাই করার দাবি রাখে।

পাঁচ দিন ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার সরাসরি আর্থিক অভিঘাতও কম নয়। রেলওয়েকে ফেরত দিতে হয়েছে ১১ হাজার ৩৩৭টি টিকিটের মূল্য। শুধু টিকিট বাবদ ফেরত দেওয়া হয়েছে ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৪ টাকা।

কিন্তু প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এখানেই শেষ নয়। ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় পরবর্তী দিনের অগ্রিম টিকিট বিক্রিতেও বিঘ্ন ঘটে। কক্সবাজারগামী বহু যাত্রী ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করেন।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কক্সবাজারমুখী যাত্রীদের একটি অংশও রেলপথের অনিশ্চয়তার কারণে ভ্রমণ বাতিল বা বিকল্প পরিবহন বেছে নেন।

ফলে ক্ষতির হিসাব শুধু বাতিল টিকিটের ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৪ টাকায় সীমাবদ্ধ নয়। পরবর্তী সময়ে যাত্রী কমে যাওয়া, অগ্রিম টিকিট বিক্রি ব্যাহত হওয়া এবং রেলের প্রতি আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব-সব মিলিয়ে আর্থিক ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও বড় হতে পারে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে (পূর্ব)-এর মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন গণমাধ্যমকে দাবি করেছেন, অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম নগরীর প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায় রেললাইন দুই ফুট পানিতে তলিয়ে গেলেও অবকাঠামোগত বড় কোনো ক্ষতি হয়নি।

তবে যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে।

রেলওয়ের এই বক্তব্যের সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্নের একটি জায়গায় পার্থক্য রয়েছে। অবকাঠামোর বড় ক্ষতি না হলেও যদি একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ পাঁচ দিন বন্ধ থাকে, দুই ফুট পানিতে তলিয়ে যায় এবং পরে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ পাঁচ ফুট উঁচু করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তাহলে নির্মাণ ও নকশার কার্যকারিতা নিয়ে স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন কি না-সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের জানালীহাট ও ষোলশহর স্টেশন ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। টিকিট কালোবাজারি, বুকিং কর্মীদের সঙ্গে যোগসাজশ, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং যাত্রী হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সময়ে উঠেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের একাধিক আকস্মিক এনফোর্সমেন্ট অভিযানে রেলওয়ের বুকিং সহকারী ও টিকিট কালোবাজারি চক্রের যোগসাজশের অভিযোগও সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অভিযানে জড়িত কর্মকর্তা ও টিকিট কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশের কথাও জানা গেছে।

রেলওয়ে (পূর্ব)-এর সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীনের দায়িত্ব পালনকালেও টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে স্টেশনগুলোতে তদারকি বাড়ানো এবং যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

তবে এখানেই শেষ নয়। নিয়োগ কিংবা উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে দুদকের তদন্ত ও অভিযানও নতুন কোনো বিষয় নয়।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের তদারকি ও দায়িত্বের বিষয়টিও স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আসে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতিতে জড়িত-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও প্রমাণ প্রয়োজন।

রেললাইন ডুবে যাওয়ার পর এখন ঝুঁকিপূর্ণ অংশ পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রয়োজনীয় সংস্কার অবশ্যই করতে হবে। যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং রেল যোগাযোগ সচল রাখতে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের বিকল্প নেই। কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে আরেকটি আশঙ্কা।

অভিযোগ রয়েছে, দুর্বল নকশা বা অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর কারণে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের নামে নতুন করে বড় প্রকল্প গ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আর সেই প্রকল্পে যদি স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, স্বাধীন প্রকৌশল যাচাই এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে একটি ভুলের দায় চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে আরেকটি নতুন প্রকল্পের ওপর।

তাই এবার শুধু রেললাইন উঁচু করলেই হবে না। তদন্ত করতে হবে কেন রেললাইন ডুবল।

জানতে হবে, নকশা কে করেছে, অনুমোদন দিয়েছে কে, নির্মাণের সময় পানি প্রবাহের বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল, কালভার্ট ও ড্রেনেজের সক্ষমতা কত ছিল এবং কাজের মান যাচাই করেছিলেন কারা।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় যোগাযোগপথ। এই রুটে কয়েক দিনের বিপর্যয় শুধু যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ায়নি, রেলওয়ের আর্থিক ক্ষতিও করেছে। তাই এখন প্রয়োজন দায় এড়িয়ে যাওয়ার নয়, দায় নির্ধারণের।

অতিবৃষ্টির সঙ্গে অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, ভুল নকশা, অপর্যাপ্ত কালভার্ট কিংবা জলপ্রবাহের পথ বাধাগ্রস্ত করার মতো কোনো অবকাঠামোগত ত্রুটি যুক্ত ছিল প্রমাণ হলে এর দায় নির্ধারণ করতে হবে।

আর যদি প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে জানালীহাট ও ষোলশহর স্টেশন ঘিরে অতীতে ওঠা টিকিট কালোবাজারি ও অনিয়মের অভিযোগও নতুন করে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কারণ, দুই ফুট পানিতে ডুবে যাওয়া রেললাইন শুধু একটি যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা নয়, এটি হতে পারে একটি বড় ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতার দৃশ্যমান চিহ্ন।

আর পাঁচ ফুট উঁচু করে রেললাইন পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত যদি সত্যিই প্রয়োজনীয় হয়, তাহলে তার আগে একটি প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানা দরকার-যে রেললাইন আজ পাঁচ ফুট উঁচু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটি নির্মাণের সময় ভবিষ্যতের পানি কোথায় যাবে-এই প্রশ্নটি কি কেউ করেছিলেন?