বদলে গেছে ডেঙ্গুর চেনা উপসর্গ, উচ্চ জ্বর নেই, তবু হাসপাতালে ভিড়!

৬ মাসের রেকর্ড ভাঙল ২১ দিনে

প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬ ১৩:৩১

শরীরের তাপমাত্রা খুব একটা বাড়ে না। চামড়ায় রক্তবর্ণের কোনো ফুসকুড়ি বা র‍্যাশের চিহ্নও দেখা দেয় না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে-হয়তো সামান্য কোনো মৌসুমি ক্লান্তি বা সাধারণ ভাইরাল জ্বর।

অথচ রক্তপরীক্ষার কাচ বসাতেই বেরিয়ে আসছে ভয়ংকর সত্য। ডেঙ্গু এবার আর তার চেনা বেশে আঘাত হানছে না, রূপ বদলে নিঃশব্দ ঘাতকের মতো শরীর অচল করে দিচ্ছে।

ঠিক এই ছদ্মবেশী আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছেন চট্টগ্রামের কাঠমিস্ত্রি শাহ আলম (৪০)। তিন দিন ধরে শরীরে অস্বস্তি ছিল, কিন্তু গা পুরে যাওয়া জ্বর ছিল না।

সাধারণ ক্লান্তি ভেবে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আচমকাই শরীর ভেঙে পড়ে, হাত-পায়ের তীব্র ব্যথার সাথে শুরু হয় অসহ্য দুর্বলতা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ১৬ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডের শয্যায় শুয়ে বিষণ্ণ কণ্ঠে শাহ আলম বলছিলেন, কোথা থেকে মশা কামড় দিল কিছুই টের পেলাম না। ভেবেছিলাম মামুলি জ্বর, কিন্তু পরীক্ষা করিয়ে দেখি শরীর ভেতরের রক্তচাপ আর রক্তের উপাদান কেড়ে নিচ্ছে ডেঙ্গু।

শাহ আলমের এই গল্প আজ চট্টগ্রামের শতাধিক পরিবারের বাস্তব চিত্র। নগরের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামীণ জনপদেও ছড়াচ্ছে এই নিরব আতঙ্ক।

২১ দিনের ঝড়ে উল্টে গেল ৬ মাসের হিসাব

পরিসংখ্যানের খাতা খুললে দেখা যায় ডেঙ্গু সংক্রমণের এক আশঙ্কাজনক গতি। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত-বছরের প্রথম ছয় মাসে পুরো জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৯৮ জন। অথচ চলতি জুলাই মাসের প্রথম ২১ দিন পার হতেই সেই সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে সাম্প্রতিক রোগীর সংখ্যা।

যা বছরের মোট আক্রান্ত (গতকাল পর্যন্ত) ৬০৩ জন। যার মধ্যে প্রথম ৬ মাসের আক্রান্ত (জানুয়ারি–জুন) ২৯৮ জন, জুলাইয়ের প্রথম ২১ দিনে আক্রান্ত ৩০৫ জন।

স্বাস্থ্য বিভাগের ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছর জুলাই থেকে নভেম্বর-এই পাঁচ মাসেই মোট রোগীর ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

২০২৫ সালেও এই নির্দিষ্ট মেয়াদে ৪,০৬৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, যেখানে পুরো বছরে আক্রান্ত ছিলেন ৪,৮৪৬ জন।

গত কয়েক বছরের স্বাভাবিক গড়ের তুলনায় বর্তমানে চট্টগ্রামজুড়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কম দেখালেও, জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহের পর থেকে সংক্রমণের সূচক যেভাবে ঊর্ধ্বমুখী, তা বড় ধরনের বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ছদ্মবেশী উপসর্গ: জ্বর কম, অর্গান জটিলতা বেশি

গত জুনে চট্টগ্রাম জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের করা একটি জরিপে উঠে আসে উদ্বেগজনক চিত্র-প্রতি ১০০টি বাড়ীর অন্তত ২৭টিতেই সক্রিয় এডিস মশার লার্ভা বিদ্যমান।

এরপরের ভারী বৃষ্টিতে জমে থাকা পানি মশার বংশবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। যার করুণ প্রতিফলন এখন জেনারেল হাসপাতাল ও চমেক হাসপাতালের করিডোরগুলোতে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো ভাইরাসের চালচলনের এই অভাবনীয় রূপান্তর। সাধারণ ডেঙ্গু জ্বরে উচ্চমাত্রার শরীরের উত্তাপ ও চর্মরোগের প্রকাশ প্রাথমিক নির্দেশক হিসেবে কাজ করলেও, এবার দৃশ্যপট ভিন্ন।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) এ এস এম লুৎফুল কবির গণমাধ্যমকে জানান, অনেক রোগীরই গায়ে উচ্চমাত্রার জ্বর থাকছে না, র‍্যাশও অনুপস্থিত।

অথচ তারা হাসপাতালে আসছেন ক্রমাগত বমি, তীব্র পেটে তীব্র যাতনা, ডায়রিয়া কিংবা লিভার ও কিডনির মারাত্মক জটিলতা নিয়ে।

এমনকি রোগীদের মধ্যে রক্তচাপ হঠাৎ পড়ে যাওয়া অর্থাৎ ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম’-এর লক্ষণ বেশি দেখা যাচ্ছে। সূত্র-প্রথম আলো

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর মূল চিকিৎসা হলো সঠিক সময়ে রোগীর শরীরের তরল বা ফ্লুইডের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা। সাধারণত জ্বর কমে যাওয়ার পরেই প্লাটিলেট বা অনুচক্রিকা কমতে শুরু করে।

প্লাটিলেট ১০ হাজারের নিচে নেমে গেলে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি তৈরি হয়, যা রোগীকে দ্রুত সংকটাপন্ন অবস্থায় নিয়ে যায়।

তাই প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গ স্পষ্ট না থাকায় রোগীরা চিকিৎসা নিতে দেরি করছেন, যা জীবনঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নগরের চেয়ে গ্রামে থাবা বেশি: হটস্পট এখন সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী

এবারের ডেঙ্গু কেবল শহরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই, বরং গ্রামীণ জনপদে ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত গতিতে। চলতি জুলাইয়ের প্রথম তিন সপ্তাহে ভর্তি হওয়া ৩০৫ জন রোগীর মধ্যে ১৮৪ জনই নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা, যেখানে নগর থেকে ভর্তি হয়েছেন ১২১ জন।

এলাকা / উপজেলা আক্রান্তের পরিস্থিতি ও বিশেষ তথ্য
সীতাকুণ্ড উপজেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ আক্রান্ত (৫৯ জন) এবং ১ জনের মৃত্যু।
কর্ণফুলী দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্ত এলাকা (৩১ জন)।
চট্টগ্রাম নগর ১ জনের মৃত্যুসহ পাহাড়তলী, উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, বাকলিয়া ও পাথরঘাটায় উচ্চ ঝুঁকি।

গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৬ জন (নগরের ৭, উপজেলার ৬ ও অন্য জেলার ৩)। মোট চিকিৎসাধীন ছিলেন ৯২ জন।

চট্টগ্রামের মোট আক্রান্তের প্রায় ৯৫ শতাংশ রোগীই ভর্তি রয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে।

ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড ও সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ

সম্প্রতি এক সমীক্ষায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আটটি ওয়ার্ডকে ‘রেড জোন’ বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে-উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাথরঘাটা এবং আন্দরকিল্লা।

উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম জানান, চিহ্নিত হটস্পটগুলোর জন্য ৬০ জনের একটি বিশেষ প্রশিক্ষিত দল প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রতি ওয়ার্ডে প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে পর্যায়ক্রমে লার্ভিসাইড প্রয়োগ ও ফগিং কার্যক্রম চলছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম জোর দিয়েছেন সামাজিক সচেতনতার ওপর।

তিনি বলেছেন, হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলানোর জন্য চিকিৎসা প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। তবে কেবল ওষুধ ছিটিয়ে বা চিকিৎসা দিয়ে সংক্রমণ রোখা সম্ভব নয়, যদি না গৃহস্থালি পর্যায়ে জমা পানি পরিষ্কারে নাগরিকদের সচেতন থাকতে হবে।

তাছাড়া সময়মতো রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিলে এ বছর ঝুঁকি অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম।

সিভিল সার্জন থেকে বলা হয়, জ্বর না থাকলেও শরীরের অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বমি কিংবা পেটের ব্যথাকে অবহেলা না করে দ্রুত রক্ত পরীক্ষা করানোই এখন বেঁচে থাকার প্রথম শর্ত।

ছদ্মবেশী এডিসের এই বিস্তার রুখতে ব্যক্তিগত সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।